ডিজিটাল সেবার আওতায় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনতে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দেশে স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ডিভাইস পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা।
একই সঙ্গে আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা চূড়ান্ত করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
চীনভিত্তিক বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের অংশীদারত্বে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেন, সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আওতায় আনতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের ব্রডব্যান্ড এবং টেলিকম অবকাঠামো গড়ে তোলা, কেবল সংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পখাতের দক্ষতা, সাপ্লাই চেইন, গ্রাহক সেবা ও নাগরিক সেবার মান বাড়াতে বাস্তবমুখী ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ও ডেটা সক্ষমতা তৈরি, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং গবেষণার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক সক্ষমতা সরাসরি প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। উচ্চমানের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণ প্রজন্মকে ক্ষমতায়ন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রযুক্তিকে উন্নয়নের প্রধান অনুঘটক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ডিজিটাল ব্যবধান কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সক্ষমতায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। ইন্টারনেটের আন্তর্জাতিক সংযোগ ও এর অর্থপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যকার এই ব্যবধানই চলতি দশকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে সরকারের ভাবনা ও কর্মপরিকল্পনার চারটি মূলনীতি তুলে ধরেন তিনি।
কামরুজ্জামান বলেন, এককভাবে সরকারের পক্ষে ডিজিটাল রূপান্তর সম্ভব নয়। সরকারের কাজ একটি পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদন ব্যবস্থা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে শিল্পের দায়িত্ব উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া।
সরকারের কর্মপরিকল্পনার চার মূলনীতি
১. সংযোগ হতে হবে অর্থপূর্ণ
শুধু সিগন্যাল পেলেই হবে না; নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী ডিভাইস এবং ব্যবহারযোগ্য ডেটা প্যাকেজ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিজ নিজ এলাকায় এবং বাংলা ভাষায় এসব সেবা পৌঁছানো জরুরি।
এর বাস্তব পরীক্ষাটি খুবই সহজ- একজন শিক্ষার্থী কি তার পাঠ সম্পন্ন করতে পারছে? একজন রোগী কি ডিজিটাল মাধ্যমে চিকিৎসকের রেফারেল পাচ্ছেন? কিংবা একজন গ্রামীণ উদ্যোক্তা কি বারবার চেষ্টা না করেই তার পণ্যের কেনাবেচা শেষ করতে পারছেন?
২. নেটওয়ার্ক হতে হবে নির্ভরযোগ্য
এর অর্থ হলো আরও বেশি টাওয়ারকে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে বরাদ্দকৃত স্পেকট্রামেরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশের জন্য প্রয়োজন টেকসই রাউটার, নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং প্রশিক্ষিত জরুরি দল, যারা সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।
৩. প্রযুক্তিতে শৃঙ্খলার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে
সব প্রযুক্তি একই গতিতে পরিপক্বতা লাভ করে না। স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজি, নতুন ক্যাপাসিটি ব্যান্ড কিংবা ভবিষ্যতের সিক্সজি- প্রতিটির বাস্তবায়নই হতে হবে বাস্তব চাহিদা, বলিষ্ঠ নীতিমালা ও ব্যাকহলের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে।
সরকারের কৌশল পরিষ্কার- প্রযুক্তি তখনই গ্রহণ করতে হবে, যখন তা যৌক্তিক খরচে মানুষের বাস্তব চাহিদা মেটাতে পারে।
৪. সবকিছুই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে
সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং এআইয়ের জবাবদিহিতামূলক ব্যবহারই যেকোনো প্রযুক্তি গ্রহণের মূল ভিত্তি। আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে মানুষ যত উন্নত ডিজিটাল সেবাই হোক না কেন, তা ব্যবহার করবে না।
৫-৬ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে এআই নীতিমালা
আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এআই নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা।
তিনি বলেন, ‘বিসিজি (বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ)-এর এক গবেষণা বা জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তাই আমরা কী করছি?’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি ফিচার ফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ৯৯৯ টাকা এবং একটি স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ১০,০০০ টাকার কাছাকাছি। তাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সামগ্রিকভাবে সরকার দেশে স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার দাম হবে আনুমানিক ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে।’
ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি হুয়াওয়ের
অনুষ্ঠানে হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে আমাদের সক্ষমতার মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে, নতুন সেবা উদ্ভাবনে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে আমরা কাজ করতে চাই।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ।
