মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৪ সকাল
নিউজ ডেস্ক: বাজারে আসতে শুরু করেছে সুপারি। কাঁচা ও পাকা সুপারি কিনতে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে ভিড় করছেন ক্রেতারা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট কেনাবেচায় মুখর জেলার শতাধিক হাটবাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গ্রামের ছোট ছোট হাট থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছেন। আর জেলার বাইরের পাইকারেরা এসব সুপারি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী এলাকার সুপারিবাজারে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে সুপারির বড় বড় স্তূপ সাজানো। ক্রেতারা এক স্তূপ থেকে অন্য স্তূপে গিয়ে সুপারি দেখছেন। দরদামে মিললেই বস্তা ও ঝাঁকায় ভরে কিনছেন। পরে যানবাহনে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন দূরদূরান্তে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহে দুই দিন উত্তর তেহমনী বাজারে সুপারি কেনাবেচা হয়। এখানে পণ ও কাউন হিসেবে সুপারি বিক্রি করা হয়। বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়। আর প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) সুপারি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। শুধু তেহমনী বাজারেই প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
লক্ষ্মীপুরের অন্যতম সুপারির বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসি এবং রামগঞ্জের উপজেলা শহর, সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও সুপারি কেনাবেচা হয়।
মৌসুমে এসব বাজারে বাগানমালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুপারি নিয়ে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে সুপারি কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
দুই যুগ ধরে লক্ষ্মীপুরে সুপারির ব্যবসা করছেন রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান। তিনি জেলার বিভিন্ন হাটবাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুপারি কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন।
মোখলেছুর রহমান বলেন, সুপারির মৌসুমে কেনাবেচা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততাও বাড়ে। স্থানীয় বাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়। প্রতিবছর তাঁর মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে দাবি করেন তিনি।
বিক্রেতা ও চাষিদের তথ্য অনুযায়ী, সুপারি সাধারণত তিনভাবে বিক্রি হয়—পাকা, ভেজানো ও শুকনা। বর্তমানে বাজারে মূলত পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদিত সুপারির বড় একটি অংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। নদী-নালা, খাল-ডোবা, পুকুর ও পানিভর্তি পাকা চৌবাচ্চায় সুপারি ভিজিয়ে রাখেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় কিংবা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়।
রায়পুরের চর মোহনা গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাগানের সুপারি পেকে যায়। এ সময় ভেজানো সুপারির মজুতদারেরা দলবদ্ধভাবে বাজার থেকে সুপারি কেনেন। কেনা সুপারির বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। কৃষকদের সুপারি বিক্রি শেষ হলে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে বাজারে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। তখন ভেজানো সুপারি বেশি বিক্রি হয়।
সুপারির মৌসুমে বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আয় করেন গাছ থেকে সুপারি পাড়ার শ্রমিকেরাও। সুপারি সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, ভেজানো ও শুকানোর কাজের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষের জীবিকা নির্ভর করে এ মৌসুমের ওপর।
রায়পুরের কেরোয়া এলাকার রুবেল হোসেন ২০ বছর ধরে লক্ষ্মীপুরে গাছ থেকে সুপারি পাড়ার কাজ করছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে ১০ টাকা করে পান। মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে সুপারি পাড়েন তিনি। এতে তাঁর দৈনিক আয় হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
রুবেল হোসেন আরও বলেন, একটি গাছ থেকে দুই থেকে তিনবার সুপারি পাওয়া যায়। মৌসুমে আয় ভালো হওয়ায় পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয়ও করা সম্ভব হয়।
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানান, লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। একবার সুপারি চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একটি সুপারিগাছ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ থাকায় সুপারি চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
ভালো দাম পাওয়ার আশায় লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সুপারির বাগান গড়ে তুলছেন অনেকে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল। বর্তমানে বাগানের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর জেলায় সুপারি উৎপাদিত হয়েছে ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়। এ সময় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। সুপারির বাজার ভালো থাকলে কৃষকের আয় বাড়ে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ উপকৃত হন।’
জহির আহমেদ বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এরপরই রয়েছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর পাকা, শুকনা ও ভেজানো মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন কৃষকেরা।’
