সূর্যোদয়ের দেশের রাজধানী টোকিওতে নতুন সম্ভাবনার আলোয় উন্মোচিত হলো বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায়। দুই দেশের জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ ও সাদা-লাল রঙের মেলবন্ধনে সজ্জিত জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সুসজ্জিত সামরিক দলের গার্ড অব অনার, দুই সরকারপ্রধানের আন্তরিক করমর্দন আর আনুষ্ঠানিকতার পরতে পরতে বন্ধুত্বের বার্তা- সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের সকালটি ছিল বাংলাদেশময়।
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের পুরনো অধ্যায়ে ছিল উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ ও পারস্পরিক আস্থার গল্প। এবার সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ঢাকা ও টোকিও। লক্ষ্য- বন্ধুত্বের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন, জাপানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মানুষের জন্য অভিন্ন সমৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা উঠে আসে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান।
সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বার্তা এসেছে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ ঘিরে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে জ্বালানি, শিল্প ও লজিস্টিকসের প্রধান কেন্দ্রে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তির অগ্রগতি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান এ সফরকে দিয়েছে বহুমাত্রিক তাৎপর্য।
জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর, কৃষি, মৎস্য, প্রতিরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই, জ্বালানি নিরাপত্তায় ঋণসহায়তা, মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এখন এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে এবং আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অংশীদার হতে আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তার সরকার জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে কাজ করলে আমাদের দুই মহান দেশের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।
যৌথ বিবৃতিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতে এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়। তবে এটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রক্ষেপণ; পুরো অর্থের বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে- এমন নয়।
বাংলাদেশে উৎপাদনশিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জাপানের পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ও বাজারের সম্ভাবনার সমন্বয় হলে নতুন শিল্প স্থাপন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দক্ষ কর্মী তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে ইপিএ সই হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যৌথ বিবৃতিতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের এ-সংক্রান্ত অনুরোধ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার কথা জানিয়েছে জাপান।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক বিনিময় হয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, রেলপথ ও অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি আরও জানান, সফরকালে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাপান একাধিক সমঝোতা স্মারক বিনিময় করেছে। দুই দেশের আলোচনার ফল ও অভিন্ন অগ্রাধিকার যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্পায়নে জাপানের সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে মাতারবাড়ী। যৌথ বিবৃতিতে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-ব উদ্যোগকে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা যৌথ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে জ্বালানি, শিল্প ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু বন্দর নির্মাণ নয়; বরং বন্দরকে ঘিরে শিল্প স্থাপন, পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো তৈরি করা।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি, ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পরিবহন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা ও শিল্পায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকল্পের সময়সূচি, অর্থায়ন, পরিচালন কাঠামো ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণ
জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতা বাড়াতে জাপানের সহায়তাও আলোচনায় এসেছে। যৌথ বিবৃতিতে ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট লোন ফর এনহ্যান্সিং ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড স্টেবল এনার্জি সাপ্লাই’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণসহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে আরও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতাপত্রের কথা যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ও জাপানের সহযোগিতা এখন অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও বিস্তৃত হচ্ছে। যৌথ বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তির উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিটি সই হয়েছে এবং কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা (ওএসএ) এবং উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশের জন্য টহলযান ও নৌযান সহায়তার বিষয়ও বিবৃতিতে এসেছে। এর মধ্যে জাপানের ওডিএ কর্মসূচির আওতায় একটি টহল জাহাজ এবং ওএসএ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহল নৌযানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক যোগাযোগপথের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতার পরিসর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়েও যৌথ বিবৃতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সমর্থন
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে জাপান। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়েও সমর্থন জানিয়েছে দেশটি।
সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও দুই দেশের নেতারা আলোচনা করেছেন। হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা এবং গাজা পুনর্গঠন ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয় যৌথ বিবৃতিতে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা এবং জাপানের শ্রমবাজারে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যৌথ বিবৃতিতে জাপানি ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জাপানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বৃত্তি কর্মসূচির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলে জাপানে বাংলাদেশের কর্মীদের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভাষা, কারিগরি দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন হবে, যাতে কর্মীরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন।
স্থানীয় সরকার উন্নয়নেও সহযোগিতার কথা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ঋণসহায়তার বিষয় যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদান, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বন্ধুত্বের ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপানের দীর্ঘদিনের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথম দিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর অন্যতম ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই বন্ধুত্বের জন্য বাংলাদেশ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
সরকারি সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং দেশটির জনগণের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সুস্পষ্ট- দুই দেশের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সুযোগ ও অভিন্ন সমৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা। জাপান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা এমন একটি অংশীদারত্ব গড়ে তুলি, যা আমাদের জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যাবে।
যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও দুই দেশের অবস্থান উঠে এসেছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিস্তৃত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার সামনে এসেছে।
