জন্মগতভাবে বাক্ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী আব্দুস সামাদ (৩০)। স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন না, একটি হাতও বাঁকা। তবু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। স্ত্রী ও দেড় বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে প্রতিদিন ছুটে যান কর্মস্থলে। তাঁর আত্মমর্যাদা, পরিশ্রম ও জীবনসংগ্রাম অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে স্থানীয়দের।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বারইগ্রাম বাজারে পরিচিত মুখ আব্দুস সামাদ। প্রায় ১০ বছর ধরে এই বাজারে বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারের অলিগলিতে দেখা মেলে তাঁর।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন সামাদ। পানি এনে দেওয়া, চায়ের অর্ডার পৌঁছে দেওয়া, মাছ রাখার বালতি ও ঝুড়ি আনা-নেওয়া এবং বাজার শেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তিনি। পাশাপাশি বাজারে পলিথিন বিক্রি করেও কিছু আয় করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১০ বছর আগে বারইগ্রাম বাজারে এসে সময় কাটাতেন সামাদ। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন কাজে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে শুরু করেন। নিজের পরিশ্রম ও আন্তরিকতার মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর সুসম্পর্ক। এখন বাজারের অনেক ব্যবসায়ীর কাছেই তিনি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য একজন সহযোগী।
বারইগ্রাম বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আলিম উদ্দিন বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে সামাদ বাজারের ব্যবসায়ীদের ছোটখাটো কাজে সহযোগিতা করে আসছেন। কথা বলতে না পারলেও পরিশ্রম করে আয় করেন তিনি। বাজারের সবাই তাঁকে ভালোবাসেন।
ফল ব্যবসায়ী তানভীর বলেন, আব্দুস সামাদ কারও কাছে হাত না পেতে পরিশ্রম করে উপার্জন করেন। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে বাজারের ব্যবসায়ীরা সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সামাদ সবার বড়। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও সচ্ছল নয়। তাঁর এক ছোট ভাই মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এমন পরিস্থিতিতেও সামাদ নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
সামাদের মা জানান, জন্ম থেকেই তাঁর ছেলে বাক্প্রতিবন্ধী। স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারলেও ছোটবেলা থেকেই সে পরিশ্রমী। নিজের শ্রমে আয় করে চলায় সবাই তাকে ভালোবাসেন। তিনি আরও জানান, পরিবারটি সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পায়।
ব্যক্তিজীবনে বিবাহিত সামাদের স্ত্রী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের দেড় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। প্রতিদিনের আয় নির্দিষ্ট নয়। তবু নিজের উপার্জন দিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সহযোগিতা করছেন তিনি।
আব্দুস সামাদের জীবনসংগ্রাম দেখিয়ে দেয়, শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও শ্রম, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা নিয়ে এগিয়ে চলা সম্ভব। স্থানীয়দের মতে, কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার এই প্রচেষ্টা সমাজের অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।
