একটি বইয়ের ‘কথাবস্তু’র বিরোধিতা করতে হলে তার বিপরীতে আরও একটি বই লেখা যেতে পারে। বই-পোড়ানো সমাধান হতে পারে কি?
সত্য রে লহ সহজে। বইকে ‘নিষিদ্ধ’ করা বা ‘লোপাট’ করার উপায় কখনও হতে পারে না বই-পোড়ানো। দন্ধ করে বা অন্য কোনও পদ্ধতিতে বই ধ্বংস করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘বিবলিওক্ল্যাজম’। বই-পোড়ানোর সংস্কৃতি অবশ্য বহু দিন ধরে বলবৎ আবিশ্বে। ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর ‘অ্যাক্ট অফ অ্যাপস্টেল্স’ অংশে বলা হয়েছে, সেন্ট পল ইফেসাসের মানুষদের মধ্যে থেকে প্রেতাত্মা বিতাড়ন করেছিলেন। কিন্তু ইফেসাসের বাসিন্দারা, এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েও, ঠিক সে ধরনের দুঃসাহসিক কাজ করতে না-পেরে, নিজেদের বিদ্যে বিসর্জন দেয় ও পুঁথি পুড়িয়ে ফেলে। চৈনিক সভ্যতায়, মোঙ্গল পরম্পরায়, আজটেক ও মায়া সভ্যতায় দিব্যি প্রচলিত ছিল বই-পোড়ানো। আবার হাল আমলে, বছর পঞ্চাশের মধ্যে, শ্রীলঙ্কার জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাৎসি জাগরণের ফলে, জার্মানিতে সেসব রচনা পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হয়, যা ছিল ইহুদি ও মুক্তচিন্তক বামপন্থীদের ভাবনার ফসল।
আসলে, বইকে পুড়িয়ে দিলে এক তিরে অনেকগুলি পাখি মারা যায় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, ভাষা, কৃষ্টির বহুবিধ উপাদান চিরতরে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। ১৯৪৪ সালে পোলিশ আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ‘কালাচারাল জেনোসাইড’ শব্দবন্ধ দ্বারা এই পদ্ধতিতে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। ১৮৪২ সালে রুশ সাহিত্যিক নিকোলাই গোগোল একজন ধর্মগুরুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ডেড সোল্স’-এর দ্বিতীয়ভাগ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, কাজটি ‘ভুল’ হয়েছিল। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক উপন্যাসে বই-পোড়ানোর এক বিচিত্র আখ্যান রয়েছে। ‘কালো টাকা’ সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল হার্ড বাউন্ড বইয়ের মতো করে বাঁধাই করে। ব্যোমকেশ, নির্মম চিত্তে, ‘কালো টাকা’-র প্রতিটি নোটকে আগুনে ‘উৎসর্গ’ করে, প্রতিবিধান করে। তবে এটি নিশ্চয়ই ‘কালাচারাল জেনোসাইড’ নয়। বই-পোড়ানো মানে লেখকের চিন্তাধারা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে অস্বীকার করা, তাকে বিনষ্ট করা, পল্লবিত হতে না-দেওয়া। সমাজের রক্ষণশীল অংশ, যারা অচলায়তনের পক্ষে, তারা সাধারণত বই পুড়িয়ে মনে করে, সমাজকে বিভ্রান্তি ও প্ররোচনামূলক জ্ঞানচর্চা থেকে নিবৃত্ত করা গেল, নিরাপদে রাখা গেল। যদিও তা বাস্তবে ঘটে না।
একটি বই যে-বিষয়ে আমাদের শিক্ষিত ও দীক্ষিত করতে চাইছে- যদি তার বিরোধিতা করতে হয়, তাহলে তা করতে হবে বিপরীত যুক্তি-সমারোহে। একটি বইয়ের কথা কেন মান্য করা হবে না, সে-কথা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে অন্য একটি বই লিখে, বা অন্যভাবে লিখিত বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে। এর বদলে যদি আমরা বইটিকে ধ্বংস করে দিই বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলি, তাহলে জ্ঞানতত্ত্বের চর্চা পূর্ণতা পেতে পারে না। সম্প্রতি দুর্গাপুজোর সময় বামপন্থীদের স্টলে রাখা বিশেষ ধরনের কিছু বইকে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই বই-দর্শনে যদি অনাস্থা থাকে, তাহলেও বিনষ্ট করার বদলে পাল্টা যুক্তি দিয়ে সেসব বইয়ের গুরুত্বকে খারিজ করা উচিত।
