আসন্ন পবিত্র রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে চিনি আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন এবং ছোলা ৭০ হাজার টন। এদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুরের জাত, মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় শুল্ক কাঠামো সহজ ও যৌক্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় ভোজ্যতেল, ডিম, ডাল, ছোলা, খেজুর ও চিনিসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ, আমদানি এবং মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি আসন্ন রমজানে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, দাম স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের ওপর গুরুত্ব দেন।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ সময়ে ভোজ্যতেলের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।
এছাড়া সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ১৩ হাজার টন বেশি।
চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৫ লাখ ৩৪ হাজার টন। ফলে চিনির আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। এ সময়ে চিনির এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনে।
রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। এ সময়ে ছোলার এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।
অন্যদিকে, মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডালের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনে। খেজুর আমদানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার টন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ এসব পণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিমাণ বাড়ায় রমজানে বাড়তি চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দাম কমেছে এবং ভোজ্যতেল ও চিনির দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
সভায় বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুরের জাত, গুণগত মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় শুল্ক কাঠামো সহজ, স্বচ্ছ ও যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। পণ্যের এ বৈচিত্র্যের কারণে একই ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আমদানিকারকদের জন্য সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত শুল্কব্যবস্থা প্রয়োজন।
শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সভায় খেজুরের প্রচলিত শুল্ক সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি খেজুরের নির্দিষ্ট মূল্য ধরে শুল্কায়নের পরিবর্তে প্রকৃত গুণগত মান ও আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
আমদানিকারকেরা জানান, সাধারণ মানের খেজুরের ক্ষেত্রে প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্যায়ন না হলে শুল্ক ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার, বাড়তি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় এবং এলসি খোলার জটিলতা যুক্ত হলে বাজারে পণ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
ফল আমদানিকারকেরাও উচ্চ করহারের বিষয়টি তুলে ধরে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিয়ে ফল আমদানির কর কাঠামো আরও সহনীয় করার দাবি জানান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মসুর ডালের দাম কমেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি, আমদানি ব্যয় এবং স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তাজা ফলের দামও কিছুটা কমেছে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
