জালালাবাদ রিপোর্ট: মাঠ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক বক্তব্য ও পারস্পরিক বিরোধের ঘটনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরে বিভাগীয় কমিশনারের আচরণ নিয়ে বিতর্ক, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের ইউএনওকে জড়িয়ে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বক্তব্যের ঘটনা প্রশাসনের পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এসব ঘটনা ঘিরে কর্মকর্তারা রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচার যথাযথভাবে জানেন কি না, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কতটা বজায় রাখছেন এবং প্রশিক্ষণ ও তদারকির ব্যবস্থা যথেষ্ট কি নাÑ এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয় বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, প্রশাসনের কারা নেতিবাচক মন্তব্য করছে নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখছে সরকার। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। অভিযোগ যাচাই করে প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর শেষে বিমানবন্দরে তার সঙ্গে করমর্দনের পর বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীর আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরার মতো ভঙ্গি করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগ ওঠে। ওই রাতেই তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এর কয়েক দিনের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা হয়। একটি দুর্গামন্দিরে সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের বক্তব্যের সময় তাকে হাততালি দিতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চান। পরে সমালোচনার মধ্যে ইউএনও বলেন, ‘আমি এখন বিএনপির নেতা’। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমর্থনসূচক আচরণ সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
এদিকে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউএনও শিল্পী রানী মোদক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তর বিরোধও আলোচনায় এসেছে। ২৩ অক্টোবর রাতে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে আরিফুর রহমান নিজের মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করেন এবং প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগের কথা লেখেন। পরে পোস্টগুলো মুছে ফেলা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএনওর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ঘিরে তাদের মধ্যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অসুস্থ হয়ে পড়া এসিল্যান্ডকে পরে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাগত আচরণ, রাষ্ট্রাচার সম্পর্কে জ্ঞান এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগের সময় যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, আচরণবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং কার্যকর তদারকি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব বাড়াতে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা, রাজনৈতিক চাপমুক্ত পদায়ন এবং দায়িত্ব পালনের নিয়মিত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জনসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়াও জরুরি। কয়েকটি ঘটনার দায় পুরো প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, আবার অভিযোগগুলো উপেক্ষা না করেও প্রশাসনিক সংস্কারের পথ খুঁজতে হবে।
মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করেছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।
ভোলায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ঘুষ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ঘুষ ও লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আগের সরকারের আমলে ঘুষ খাওয়া এবং ভালো কাজ আটকে দেওয়ার প্রবণতা এখনও রয়েছে। তার বক্তব্যে প্রশাসনের পুরনো অনিয়ম ও কাজের সংস্কৃতি পরিবর্তনের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ পায়।
তা ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অনৈতিকতার প্রভাব প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছে। এসব বক্তব্য প্রশাসনের জবাবদিহি ও সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতিফলন।
