আনিসার দাদা ধানখেতে অনেক ধান রেখে দিয়েছেন ধানগাছসহ। দাদার কাণ্ড দেখে বাড়ি ফিরে দাদির কাছে ফিসফিস করে আনিসা বলল, ‘দাদিম্মা, দাদা কিছু বোঝে না, ধানখেতে খড়ের মধ্যে এখনও অনেক ধান আছে। এক-দুই বস্তা তো হবেই।’
দাদি ওর দিকে স্নেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে চলো, একটা জিনিস দেখাই।’
এ বছর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা আগেই শেষ হয়েছে। আনিসা এক মাসের শীতের ছুটি দাদাবাড়ি কাটাবে। দাদির কুচকানো শীর্ণ হাতের মধ্যে নিজের কোমল হাতটা রেখে সঙ্গে এগিয়ে গেল ও। ঘরের পেছনে সবজিখেত। এরপর এক সারি কামরাঙা গাছ। তারপর লিচু, কাঁঠাল, বরই, সফেদা এসব ফলের বাগান। আনিসা বুদ্ধিমানের মতো বলে, ‘এত কামরাঙা গাছ কেন? বেশি কামরাঙা খেলে কিডনি নষ্ট হয়।’ বাড়িতে মোটে তিনজন লোক। দাদা, দাদি ও মান্তু। মান্তু বাড়ির কাজ করে, আবার স্কুলেও পড়াশোনা করে। দাদি গাছের দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে দেখো, আমাদের পরিবারের আরও কত সদস্য। ওরা কামরাঙা পছন্দ করে।’ আনিসা অবাক, পরিবারের সদস্য কি কখনও গাছে থাকতে পারে? তাকিয়ে দেখে গাছে অগুনতি টিয়া পাখি। লাল ঠোঁট দিয়ে কচকচ করে কামরাঙা কাটছে। গাছের নিচে সাদা সবুজ বুটিতোলা চাদরের মতো কামরাঙা কুচি পড়ে আছে।
বাগানের বাঁশের গেটে হুড়কো লাগিয়ে দাদি আনিসাকে নিয়ে এবার পূর্বদিকের খেতের দিকে এগোলেন। ধানখেতের ফাঁকা মাঠে দাদা রবিশস্য ফেলার জন্য মাটি তৈরি করছেন। সঙ্গে আরও তিনজন মজুর কৃষক। দাদি ধান রেখে দেওয়া খেতে গেলেন জমির আইল ধরে। অমনি অনেকগুলো চড়ুই, বুলবুলি, লেজঝোলা শ্যামা, ঘুঘু, হরিয়াল খড়ের ভেতর থেকে ডানা মেলে ঝটপট করে গাছে গিয়ে বসল। দাদিমা বললেন, ‘বুঝেছ?’ আনিসা ওর হলুদ ফিতে বাঁধা বেণি দুলিয়ে বলল, ‘বুঝেছি, আমাদের পরিবারের আরও অনেক সদস্য গাছে গিয়ে বসল।’
শুক্রবারের ছুটিতে বাবা এসেছেন। আনিসা ঘুমের মধ্যে শুনল, বাবার গলা, ‘এবারে বাঁশঝাড়টা বিক্রি করেন আব্বা। অনেক দাম পাওয়া যাবে।’ আনিসার বাবা কম বেতনের চাকরি করেন। নিজের বাবা-মায়ের জন্য ছাদ দেওয়া বড় দালান ঘর বানাতে চান বাঁশঝাড় বিক্রির টাকায়। বাঁশবাগানে শত শত পাখি বাসা করে থাকে। আজ বিকালেও আনিসা তাদের কলকাকলি শুনে এসেছে। দাদি বললেন, ‘আমাদের থাকার জন্য বড় ঘর তৈরি করতে গিয়ে শত শত পাখিকে ঘরছাড়া করতে পারবা না খোকা।’
দাদাও বললেন, ‘কোনো বাঁশগাছ কাটব না, এই টিনের ঘরেই আমরা ঠিক আছি।’
সকালে ঘুম থেকে জেগে আনিসা দেখে বাবা খুব ভোরে কর্মস্থলে চলে গেছেন। দাদি ও মান্তু গরুর খাবার বের করছেন পেছনের বারান্দা থেকে। রান্নাঘরে রাঁধুনি রহিমা খালা ছ্যাকছোক শব্দে তেলের পিঠা ভাজছেন। বাড়িজুড়ে মিষ্টি গুড়ের ঘ্রাণ। দাদা ফজরের নামাজ পড়েই সোয়েটার-চাদর গায়ে জড়িয়ে কিষানদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে চলে গেছেন। আনিসা ছুটে এসে দাদিকে জড়িয়ে ধরে তার শুকনো তোবড়ানো ঝুলে পড়া গালে একটা চুমু খায়, বলে, ‘দাদিম্মা, তুমি খুব ভালো, আমরা এই বাড়িতেই থাকতে পারব। পাখিরাও তাদের বাড়িতে শান্তিতে থাকতে পারবে। আমাদের পাখিবাড়িতে অনেক দালানকোঠার দরকার নেই।’
দাদিও তার প্রিয় নাতনিকে গভীর আদরে বুকের ভেতরে জড়িয়ে নিলেন, মেয়েটা ঠিক বুঝেছে, সবাই যদি গাছপালা কেটে ফেলে দালানকোঠা বানায়, পাখিগুলো থাকবে কোথায়?
