সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ শেষে যখন চারপাশ একটু শান্ত হয়, তখন মনের কোণটা কেমন যেন একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে, তাই না? কখনও কি মনে হয়েছে, এই যে বাইরে এত কোলাহল, এর ভিড়ে আমরা নিজেদেরই কোথাও যেন হারিয়ে ফেলছি? মন খারাপের বিকেলে কিংবা গভীর রাতে, যখন চারপাশ শান্ত, তখন এই বইগুলো হতে পারে আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। রাগ, দুঃখ, আনন্দ বা জীবনের মানে খোঁজার অনন্ত জিজ্ঞাসা — মানুষ যুগ যুগ ধরে এই উত্তরগুলোই খুঁজে এসেছে। আপনি যদি নিজেকে জানতে বা চিনতে চান, তবে এই ৬ বই আপনারই জন্য। চলুন, একে একে দেখে নেওয়া যাক।
Inner Engineering: A Yogi's Guide to Joy by Sadhguruছবি: সংগৃহীত।
আমাদের জীবনটা আসলে কেমন? আমরা যা ভাবি, যা অনুভব করি, তার বাইরেও কি কিছু আছে? সদগুরু তাঁর এই বইয়ে এই বিষয়কেই খুব সহজ করে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বাইরের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, আমাদের শান্তি বা আনন্দ পুরোপুরি আমাদের নিজের হাতেই থাকা সম্ভব। যোগব্যায়াম মানে শুধু শারীরিক কসরত নয়, তার চেয়েও অনেক গভীরে রয়েছে মনের এক আশ্চর্য জগত। আপনি যদি নিজের অন্তরের জগতটাকে নতুন করে চিনতে চান, তবে এই বই দিয়ে আপনার যাত্রা শুরু হতে পারে।
Autobiography of a Yogi by Paramahansa Yoganandaছবি: সংগৃহীত।
১৯৪৬ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি এক অদ্ভুত যাত্রার গল্প। ভারতের এক সাধারণ শিশুর আধ্যাত্মিকতার খোঁজে দূরদূরান্তে ঘুরে বেড়ানো, গুরুদের সান্নিধ্য পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পশ্চিমে গিয়ে যোগসাধনার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জীবন্ত দলিল এই আত্মজীবনী। এটি কোনও সাধারণ উপদেশমূলক বই নয়, বরং একজন মানুষের সারাজীবন ধরে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার এক মায়াবী ভ্রমণ। ক্রিয়া যোগ এবং ভারতের প্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে চাইলে এই বইয়ের জুড়ি মেলা ভার।
You Are The Sky: An Ancient Guide to Modern Feelings by Swami Swaroopanandaছবি: সংগৃহীত।
আমাদের মনে রাগ, ভয়, অপরাধবোধ কিংবা দুঃখের মেঘ জমলে আমরা প্রায়ই হারিয়ে যাই। চিন্ময় মিশনের গ্লোবাল হেড স্বামী স্বরূপানন্দ তাঁর এই বইয়ে বেদান্ত দর্শনকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে দারুণ ভাবে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, আকাশ যেমন বিশাল আর পরিষ্কার থাকে, আর মেঘগুলো শুধু ক্ষণস্থায়ী হয়ে আসে-যায়, তেমনি আমাদের আবেগগুলোও মেঘের মতো। তারা আসে, আবার চলেও যায়, কিন্তু তারা কখনই আমাদের আসল সত্তাকে মুছে ফেলতে পারে না। মনের ঝঞ্ঝাট সামলে কী ভাবে শান্ত থাকা যায়, তার এক দারুণ দিশারি এই বই।
The Power of Now by Eckhart Tolleছবি: সংগৃহীত।
আমরা কি সারাক্ষণ অতীতের কোনও না কোনও ভুলের আফসোস কিংবা ভবিষ্যতের আশঙ্কায় ভুগে মরি না? একহার্ট টোলি তাঁর এই বিখ্যাত বইটিতে ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছেন। তিনি শেখান কী ভাবে বর্তমানকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে হয় এবং নিজের মন বা চিন্তাভাবনাকে শুধু দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। জীবনের দৌড়ঝাঁপ থেকে মাঝে মধ্যে একটু বিরতি নিতে হয়। বর্তমানের ঘ্রাণ নিতে এবং মনের শান্তি খুঁজে পেতে এই বই এক মোক্ষম দাওয়াই।
The Book of Joy by the Dalai Lama and Desmond Tutu, with Douglas Abramsছবি: সংগৃহীত।
যখন জীবন আমাদের পরিকল্পনা মতো চলে না, যখন চারদিকে শুধু কষ্ট আর হতাশা, তখন কি আনন্দ খুঁজে পাওয়া সম্ভব? বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্মগুরু দালাই লামা এবং খ্রিস্টধর্মের আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু এই বইটিতে একসঙ্গে বসে জীবনের এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তাঁরা কথা বলেছেন দুঃখ, ক্ষমা, করুণা এবং কৃতজ্ঞতা নিয়ে। তাঁরা বোঝাতে চেয়েছেন, আনন্দ মানে জীবনের সব কষ্ট মুছে যাওয়া নয়। বরং সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আশার আলো বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা।
The Untethered Soul: The Journey Beyond Yourself by Michael A. Singerছবি: সংগৃহীত।
আমাদের মাথার মধ্যে যে সারাক্ষণ কথা ঘুরপাক খায়, তা কী ভাবে আমাদের জীবনকে চালনা করে? মাইকেল এ. সিঙ্গার mindfulness বা সচেতনতার আলোয় এই বিষয়টিকেই খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি আমাদের শেখান কী ভাবে নিজের মধ্যে চলা অবিরাম বকবকানি থেকে একটু দূরত্ব তৈরি করতে হয়, পুরোনো জমানো কষ্টগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। সমস্ত জটিল বিষয় থেকে বেরিয়ে কী ভাবে নিজেকে মুক্ত করতে হয়, তার দারুণ উদাহরণ এই বইটি।
একনজরে
বিষয়: মানসিক শান্তি, আত্মোপলব্ধি ও আধ্যাত্মিকতা
বইয়ের সংখ্যা: ৬
বিশেষভাবে যাঁদের বই রয়েছে: সদগুরু, পরমহংস যোগানন্দ, স্বামী স্বরূপানন্দ, একহার্ট টোলি, দালাই লামা, ডেসমন্ড টুটু ও মাইকেল এ. সিঙ্গার
কাদের জন্য: যাঁরা নিজেকে বুঝতে, আবেগ সামলাতে এবং জীবনের অর্থ খুঁজতে আগ্রহী
কী জানা যাবে: বর্তমানকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের চিন্তা পর্যবেক্ষণ করা, দুঃখের মধ্যে আনন্দ খোঁজা এবং আত্মিক বিকাশের নানা দৃষ্টিভঙ্গি
FAQ:
১. মানসিক শান্তির জন্য কোন বইগুলি পড়া যেতে পারে?
The Power of Now, The Untethered Soul এবং The Book of Joy মানসিক শান্তি, বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া ও জীবনের কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।
২. আত্মোপলব্ধির জন্য সেরা বই কোনটি?
The Untethered Soul নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য ভালো পছন্দ। অন্যদিকে, Inner Engineering আত্মিক বিকাশ ও যোগের দর্শন সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
৩. নতুন করে আধ্যাত্মিক বই পড়া শুরু করতে কোনটি বেছে নেবেন?
সহজভাবে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার ধারণা বুঝতে The Power of Now দিয়ে শুরু করতে পারেন। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও যোগসাধনার জীবনভিত্তিক বিবরণ পড়তে চাইলে Autobiography of a Yogi বেছে নিতে পারেন।
৪. মন খারাপ থাকলে কি এই বইগুলি পড়া উপকারী?
এই বইগুলি জীবনের নানা পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে, আবেগ বুঝতে এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেতে সাহায্য করতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ বা মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে বই পড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াও জরুরি।
৫. এই ছ’টি বইয়ের মূল বক্তব্য কী?
প্রতিটি বইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলেও নিজের চিন্তা ও আবেগকে বোঝা, বর্তমানকে গুরুত্ব দেওয়া, আনন্দের উৎস খোঁজা এবং আত্মিক বিকাশের মতো বিষয়গুলি ছ’টি বইয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
