বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ক্রমশ শক্তিবৃদ্ধি করছে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ১২ ঘণ্টায় তীব্র থেকে অতি তীব্র আকার নিতে চলেছে সেটি। রাত আড়াইটের হিসেব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম থেকে ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বে, ওড়িশার গোপালপুর থেকে ৩৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছে।
আবহবিদেরা মনে করছেন, ঘূর্ণিঝড়টি এ বার পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোবে। মঙ্গলবার রাতে খানিক বাঁকবদল করে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোবে সেটি। বুধবার সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পুদুচেরির ইয়ানাম উপকূলের বাপাতলা আর বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী কোনও এলাকা ধরে স্থলভাগে আছড়ে পড়বে ‘অর্ণব’। আছড়়ে পড়ার সময় অন্ধ্র উপকূলে ঘণ্টায় ১১৫-১২৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ১৪০ কিলোমিটার।
ইতিমধ্যেই অন্ধ্রের চার জেলায় ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এই জেলাগুলি হল অনাকাপল্লি, শ্রীকাকুলাম, বিশাখাপত্তনম এবং ভিজিয়ানগরম। বিপর্যয় মোকাবিলায় ২০টি জেলার জন্য ২৭ কোটি টাকা মঞ্জুর করে অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নায়ডুর সরকার। কাকিনাড়া, কৃষ্ণা এবং পূর্ব গোদাবরী জেলাকে দেওয়া হয়েছে ২ কোটি টাকা। আর বাকি ২০টি জেলাকে দেওয়া হয়েছে এক কোটি টাকা। উদ্ধারকাজে গতি আনতে কাকিনাড়া, কোনাসীমা, রাজামুন্দ্রি, এলুরু, মছলিপত্তনম এবং নাকাপল্লির মতো জায়গায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-র একাধিক দলকে মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে ইয়ানাম, কৃষ্ণা এবং বিশাখাপত্তনমেও।
সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে মঙ্গল এবং বুধবার অন্ধ্রে ৫৩টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিজয়ওয়াড়া, রাজামুন্দ্রি, কাকিনাড়া এবং বিশাখাপত্তনমের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী একাধিক ট্রেনের পরিষেবা এই দু’দিন পাওয়া যাবে না। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আটটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে ওড়িশাতেও। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিশাখাপত্তনম-কোরাপুট প্যাসেঞ্জার, বিশাখাপত্তনম-কিনান্দুল প্যাসেঞ্জার। যাত্রীদের সুবিধার্থে বিশাখাপত্তনমে বিশেষ কন্ট্রোল রুম খুলেছে দক্ষিণ উপকূলীয় রেলওয়ে।
মূলত অন্ধ্র লাগোয়া দক্ষিণ ওড়়িশায় ঘূর্ণিঝড়়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে চলেছে। বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গাড়া, মালকানগিরি, কোরাপুট এবং নবরংপুর জেলায়। এই ছয় জেলায় মঙ্গল এবং বুধবার সমস্ত স্কুল-কলেজ, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখা হচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মঙ্গল এবং বুধবার সমস্ত স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসন। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোতায়েন থাকছে ওড়িশা রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, এনডিআরএফ-এর সদস্যদের। নিচু এবং বিপদসঙ্কুল এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই বাসিন্দাদের ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিঁ বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দিয়েছেন আট মন্ত্রীকে। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন।
অর্ণবের প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলেও। উপকূল সংলগ্ন জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে থাকবে বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়া। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূল সংলগ্ন সমুদ্র উত্তাল হতে পারে। মৎস্যজীবীদের তাই আলাদা করে সতর্ক করেছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণবের’ প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল সংলগ্ন সমুদ্র উত্তাল হবে মঙ্গলবার থেকে। ঢেউ ‘অতি উত্তাল’ও হয়ে উঠতে পারে। তাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। যাঁরা গিয়েছেন, সোমবারের মধ্যেই তাঁদের ফিরে আসতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলিতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। বুধবার ভারী বৃষ্টি (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) হতে পারে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে। এই চার জেলায় ঝোড়ো হাওয়ার বেগ থাকবে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাতেও ঝোড়ো হাওয়া বইবে, সঙ্গে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি। বৃহস্পতি এবং শুক্রবার ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি জেলায়। বর্ষণের জেরে পাহাড়ি এলাকায় ধস নামতে পারে বলে সতর্ক করেছে হাওয়া অফিস।
ঘূর্ণিঝড়ের জেরে উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া গভীর নিম্নচাপ ও পূর্ণিমার কটালের জেরে নদী ও সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানা-সহ উপকূলীয় অঞ্চলের ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল থানা, গঙ্গাসাগর কোষ্টাল থানা, গোবর্ধনপুর কোষ্টাল থানার পক্ষ থেকে এলাকাবাসীকে সতর্ক করতে মাইকে প্রচার শুরু হয়েছে। মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া সকল মৎস্যজীবীদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সাগর, নামখানা-সহ উপকূলীয় এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে।
উপকূলবর্তী না-হওয়া সত্ত্বেও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে চলেছে বিহার এবং উত্তরপ্রদেশেও। পূর্ব উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। এই বিষয়ে দুই রাজ্যকে সতর্ক করেছেন ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন।
