ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে লাউয়ের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। মাঠভরা লাউ বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না তাঁরা। গ্রামে প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৪ টাকায়। অথচ শহরের খুচরা বাজারে একই লাউ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকায়। ফলে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাউচাষিরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্ষেতজুড়ে লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, শ্রমিকের মজুরি দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। লাভের আশায় যে ফসল চাষ করেছিলেন, সেটিই এখন তাঁদের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও ক্ষেতেই পড়ে থাকছে লাউ, আবার কোথাও অবিক্রীত লাউ পচে নষ্ট হচ্ছে।
শহরের বাজারে ২০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি লাউ গ্রামের হাটে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৪ টাকায়। কোথাও কোথাও চারটি লাউয়ের দাম মাত্র এক টাকা। একটু পরিপক্ব লাউয়ের দাম আরও কম। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ক্ষোভে বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন, আবার অনেকে পাকা লাউ জমিতে ফেলে রাখছেন। শেষ পর্যন্ত এসব লাউ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব চণ্ডীপুর, লিলারহাট ও কালিতলা গ্রামের লাউচাষিদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা।লোকসানে পড়া কৃষকদের একজন আদিল ইসলাম। বন্ধক নিয়ে পাঁচ একর জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন তিনি। আশা ছিল, গত বছরের মতো এবারও ভালো লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো।
আদিল ইসলাম জানান, লাউ চাষে তাঁর প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেতের ৮০ শতাংশ লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৯৬ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করতে পারছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘ক্ষেতের ৮০ ভাগ লাউ বিক্রি করে পেয়েছি ৯৬ হাজার টাকা। এই টাকায় শ্রমিকের মজুরি শোধ করতে পারছি না। গত আট দিন দেখভাল না করায় ক্ষেতের বাকি লাউয়ে ছত্রাক ধরেছে। অনেক লাউ ফেলে দিয়েছি।’
আদিল আরও জানান, গত বছর একই জমিতে লাউ চাষ করে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে তিনি সরাসরি রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজারে লাউ বিক্রি করে আসছেন। কিন্তু এবার বাজারে চাহিদা কম থাকায় লোকসানে পড়েছেন। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই সময় উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৩৯ টন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড়, রংপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও এবার লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে পাইকারি ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে। পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবার ঢাকা ও অন্যান্য জেলার বাজারে লাউয়ের চাহিদা তুলনামূলক কম। পাশাপাশি পণ্য ওঠানামা ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আগের মতো লাউ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কিসমত এলাকার কৃষক হাসিনুর রহমান ধারদেনা করে ১০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্য কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। হাসিনুর রহমান বলেন, ‘সারের দাম বেশি, কামলার দাম বেশি। ধারদেনা করি লাউ করিছিনু, আর দাম যদি ১-২ টাকা পিস হয়, তাহিলে হামেরা কেন-গো বাঁচিমো! সরকার যদি হামার তানে দামটা ঠিক করি দেয়, হামরা বাঁচবা পারিমো।’
কৃষকদের অভিযোগ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কম দামে লাউ বিক্রি করে তাঁদের পক্ষে উৎপাদন খরচ তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাঁরা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন। তবে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকট থাকলেও তাঁরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বেশি হলেও বাজারজাতকরণ ও চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের সমন্বয় না থাকলে কৃষককে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বিপণনব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা এবং দেশের বিভিন্ন বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
The post এক হাজার লাউ বেচেও কেনা যায় না এক কেজি গরুর মাংস appeared first on ভোরের চেতনা.
