পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ চাইলে সব কিছু করতে পারে— বলেছিলেন বারুইপুরের ‘এনকাউন্টারের’ পরে। তার সাড়ে তিন মাস পরে গাইঘাটার ‘এনকাউন্টারের’ পরেও একই মেজাজে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, অপরাধদমনের ক্ষেত্রে রাজ্যের নতুন সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলছে। দৃষ্টান্ত স্থাপনের বার্তা দিয়ে বললেন, মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে হলে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে।
সোমবার গভীর রাতে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় গাইঘাটায় কিশোরীকে ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের। বারুইপুরের মতো এ ক্ষেত্রেও রাতেই অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য যাওয়া হয়েছিল। পুলিশ সূত্রে দাবি, ফেরার সময় বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালান অভিযুক্ত। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে মৃত্যু হয় ২৩ বছরের ওই যুবকের।
গাইঘাটায় পুলিশি এনকাউন্টারের প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সকালে প্রশ্ন করা হয় রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপকে। উত্তর দিতে গিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের প্রসঙ্গও টেনে আনেন মন্ত্রী। “এর আগেও ঘটনা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। খুনি পালাচ্ছিল। এনকাউন্টার হয়েছে। এখানেও (গাইঘাটাতেও) হয়েছে,” বলেন দিলীপ।
এর পরেই মন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তাঁকে এমন পরিণতির জন্যই তৈরি থাকতে হবে। দিলীপ বলেন, “বিচারের সামনে সবাইকে আনতে হবে। আইনের উপরে কেউ নেই। কিন্তু কেউ যদি আইনকে অমান্য করে, তার সঙ্গে এ রকমই হবে।” পঞ্চায়েত মন্ত্রীর বক্তব্য, মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া পুলিশের কাজ। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “মানুষ তাদের (পুলিশের) উপর ভরসা রাখতে ভুলে গিয়েছে। ভরসা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতে হবে।”
মন্ত্রীর দাবি, পূর্বতন সরকারের আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তাই অপরাধীদেরও ভয় কমে গিয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ঠিক করার পাশাপাশি কিছু দৃষ্টান্তও স্থাপন করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। দিলীপের কথায়, “ভয় অত সহজে কেউ পায় না। কারণ, আমাদের বাংলায় বহু বছর কানুন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু যদি আইনকানুনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়, সবাই ভয় পাবে। সতর্ক হবে। দুটো জিনিসই করতে হবে— লোকে যাতে এ সব না করে সে জন্য সমাজে সুবিচার ও সংস্কার আনতে হবে। পরিবেশ ঠিক করতে হবে। আর কী সাজা হবে, সেটা যেন উদাহরণ হিসেবে থাকে।”
বস্তুত, গত জুলাইয়ে বারুইপুরে পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ অভিযুক্তের মৃত্যুর পরও পুলিশের প্রশংসা করেছিলেন দিলীপ। বলেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পুলিশও চাইলে সব কিছু করতে পারে, এটা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। অপরাধের বিষয়ে জিরো টলারেন্সের কথা আমরা বলেছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেমন ধরেও নিয়েছে, যখন পালাতে গিয়েছে, উৎপাত করেছে, তখন গুলি চালাতেও দ্বিধাবোধ করেনি।” উত্তরপ্রদেশ, বিহারের ‘এনকাউন্টারের’ কথা স্মরণ করিয়ে পঞ্চায়েত মন্ত্রী সে সময়ে বলেছিলেন, “অপরাধ দমনে পুলিশের হাত কাঁপবে না, সরকার পিছিয়ে যাবে না, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীও দেখিয়েছেন যে, কী ভাবে স্পটে দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলাকে ঠিক করতে হয়।”
রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বারুইপুরের ‘এনকাউন্টারের’ পর বলেছিলেন, “যাঁরা ভাবছেন পার পেয়ে যাবেন, কেউ জানতে পারবে না… কেউ আপনাদের সাহায্য করতে পারবে না, কেউ বাঁচাতে পারবে না।”
আবার মমতাপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক তথা প্রবীণ রাজনীতিক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “এনকাউন্টার করে হয়ত প্রচার পাওয়া যায়। কিন্তু দেশে একটা আইন আছে।” ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যে আইনে সংশোধনের উদ্যোগী হয়েছিল রাজ্য, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন শোভনদেব। অন্য দিকে, পুলিশের কাছ থেকে কী ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিচ্ছেন অভিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী। তার জবাবও দিয়েছেন রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া। মন্ত্রী বলেন, “পুলিশ প্রশাসন কী ভাবে চলবে, তার গাইডলাইন সুজন চক্রবর্তীর কাছ থেকে শুনবেন না পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।” তিনি বলেন, “যদি পুলিশের বন্দুক নিয়ে দুর্বৃত্ত পুলিশকেই আক্রমণ করে, তবে পুলিশ ছাড়বে কেন?”
গাইঘাটার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-ও। এক বিবৃতিতে সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূরের বক্তব্য, “রাত ১২টার সময় বন্দিকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়া গভীর সন্দেহজনক। তা-ও বন্দির হাত খোলা রেখে!” পুলিশের রিভলবার কী ভাবে ছিনিয়ে নিলেন অভিযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
