গোলাম মোস্তফা জীবন
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৪
গোলাম মোস্তফা জীবন, ছবি: সংগৃহীত
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার সুবাদে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আমার এক ধরনের সহজাত টান ছিল। তবে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর পেশাগত জীবন শুরু করি একটি এমপিওভুক্ত কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তীতে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
বহু আবেদনকারীর মধ্যে থেকে আমার মতো একজন শিক্ষককে বেছে নেওয়ার পেছনে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের মূল যুক্তি ছিল— একজন শিক্ষক হিসেবে পেশাগত সততা, সামাজিক মর্যাদা এবং নৈতিকতা বজায় রাখা সহজ এবং সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকে না। সেসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেশাদার শিক্ষকদেরই জেলা প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
তৎকালীন সময়ের কর্মপদ্ধতি ও সাংবাদিকতার রূপ ছিল বর্তমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। শিক্ষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের অর্পিত পাঠদান দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে অবসর সময়ে খবর ও ছবি ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠাতেন। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন বা ফ্যাক্সে সংবাদ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়, যার ফলে আগের দিনের খবর পরের দিনের পত্রিকায় মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হতো। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পাঠদান, ছাত্রছাত্রীদের তদারকি এবং একজন শিক্ষকের মূল দায়িত্বে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটত না। শিক্ষকতার পবিত্রতা এবং সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা তখন চমৎকার এক সুষম সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়ে সহাবস্থান করত।
তবে বর্তমান সময়ের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। সরকারি, বেসরকারি, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে এবং শিক্ষায় গুণগত মান আনতে শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময় পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত থাকা ও পাঠদানে মনোনিবেশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। সরকার ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা যখন শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও মানোন্নয়নের জন্য নানামুখী যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তখন একশ্রেণির শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর মধ্যে ব্যাপকভাবে দ্বৈত পেশা তথা সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এক নতুন ও জটিল সংকটের জন্ম দিয়েছে।
যদিও অতীতে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল, বর্তমান যুগে তা আর অনুকূল বা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেই। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান স্পষ্ট ভাষায় অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শিক্ষকতা কিংবা অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি পেশায় নিয়োজিত থেকে একই সঙ্গে সাংবাদিকতা করার কোনো সুযোগ নেই। সাংবাদিকতা একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, সংবেদনশীল ও পূর্ণকালীন দায়িত্বশীল পেশা। শিক্ষকদের যেহেতু সরকার বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়, তাই অন্য কোনো লাভজনক পেশা বা সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা পেশাগত শৃঙ্খলা ও নীতিমালার পরিপন্থী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় দ্বৈত পেশার ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক লাভজনক পদ বা চাকরিতে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না; এটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, অতীতে যখন শিক্ষকেরা সাংবাদিকতা করেছেন, তখন কি শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটেনি? এর বাস্তবসম্মত উত্তর হলো— সেকালের এবং একাালের সাংবাদিকতার ধরন ও কর্মপ্রকৃতি আকাশ-পাতাল তফাত। বর্তমানে কেবল প্রিন্ট মিডিয়া বা সংবাদপত্রের গণ্ডিতে সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক টেলিভিশন মিডিয়া, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল এবং আইপি টিভির ব্যাপক বিস্তার। বর্তমান যুগের সাংবাদিকতা মানেই প্রতি মুহূর্তে ব্রেকিং নিউজ এবং আপডেটের অসম প্রতিযোগিতা। শুধু তথ্য সংগ্রহ বা প্রবন্ধ লেখাই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষক-সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ভিডিও ধারণ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং সরাসরি খবর সম্প্রচারে অংশ নিতে হয়। ফলে একজন শিক্ষককে যখন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি খবরের পিছে ছুটতে হয়, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুম এবং পাঠদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই দ্বৈত পেশার দ্বন্দ্ব কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। বাস্তবে দেখা যায়, এই দ্বৈত পেশার সঙ্গে জড়িত অনেকেই শিক্ষক পরিচয়ের পরিবর্তে ‘সাংবাদিক’ বা ‘প্রভাবশালী প্রেস কার্ডধারী’ পরিচয়টি প্রকাশ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বর্তমান সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংবাদমাধ্যমের বাড়তি প্রভাব থাকায় অনেক সময় কিছু অস্বচ্ছ বা অনিয়মে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা পর্ষদও তাদের সমীহ করে চলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই প্রভাবশালী পরিচয়ের অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা, অসময়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করা কিংবা নিয়মিত পাঠদানে ফাঁকি দেওয়ার মতো অনৈতিক কাজ অবাধে চলে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানরাও অনেক সময় ভয়, তদবির বা প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কায় তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না। কোনো সৎ ও সাহসী প্রতিষ্ঠানপ্রধান যদি এই শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রতিবাদ করতে যান, তখন তাকে উল্টো ওই শিক্ষক-সাংবাদিকের রোষানলে পড়ে নানা ধরনের হয়রানি, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়। ফলশ্রুতিতে পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে সুমহান সম্পর্ক এবং আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ থাকার কথা, তা জিম্মি হয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, ইদানিং দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ শিক্ষকই টেলিভিশন সাংবাদিকতাসহ একাধিক মিডিয়াতে কাজ করছেন এবং নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রেসক্লাব বা অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বেও থাকছেন তারা। আর সেই প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজিসহ নিজেরাই করছেন নানা অপকর্ম। প্রভাবশালী মিডিয়ায় কাজ করা, সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে থাকা বা নেতৃত্ব দেওয়া ইত্যাদিক কারণে সরকারি কর্মকর্তারাও এদের পিছে লাগতে যান না। ফলে নির্বিঘ্নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফাঁকি দিয়ে সারা দিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ান অনেকেই।
সত্য কথা বলতে ইদানিং সিএনজি ও ট্রাক চালককে যেমন সাংবাদিকতা পেশায় আসতে দেখা যাচ্ছে, কোনো নীতিমালা না থাকায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাইটগার্ড-দপ্তরিকেও সাংবাদিকতা পেশায় আসতে দেখা যাচ্ছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট কিনে এদের কেউ কেউ বনে যাচ্ছেন বড় সাংবাদিক।
অবশ্য এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শিক্ষকেরা যদি নিছক কলামিস্ট, মননশীল গবেষক, প্রাবন্ধিক বা শিক্ষাবিষয়ক লেখক হিসেবে প্রজ্ঞালব্ধ লেখালেখির মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে অবদান রাখেন, তবে তা কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, বরং জাতির জন্য কল্যাণকর। কিন্তু ক্লাসের সময় চুরি করে ক্যামেরা, বুম, মাইক্রোফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে মাঠেঘাটে সংবাদ সংগ্রাহক বা রিপোর্টার হিসেবে দৌড়াদৌড়ি করা কোনো সুস্থ সমাজব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। মফস্বল ও উপজেলা পর্যায়ে এই অসুস্থ প্রবণতা আজ মহামারী রূপ ধারণ করেছে, যা এমপিওভুক্ত কলেজ থেকে শুরু করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরকে সবচেয়ে বেশি পঙ্গু করে দিচ্ছে।
এই পুঞ্জীভূত সংকট থেকে শিক্ষাখাতকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর, দৃশ্যমান ও আপসহীন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষকতা কোনো সাধারণ আট-পাঁচটার চাকরি নয়; এটি একটি মহান, পবিত্র এবং পূর্ণকালীন দায়িত্ব। শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে— একজন ব্যক্তিকে হয় পূর্ণকালীন শিক্ষকতা, নতুবা পূর্ণকালীন সাংবাদিকতা— যেকোনো একটি পেশাকে বেছে নিতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা জীবনকে বিপন্নতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তাই সরকারকে দ্রুত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরো বাড়তেই থাকবে। হয় শিক্ষকতা করতে হবে, না হয় সাংবাদিকতা। দুটো এক সঙ্গে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক: সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্কাই, কনসালট্যান্ট এডিটর, দ্য ডেইলি ইন্ডাস্ট্রি এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ