ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের মুখোমুখি হচ্ছে বিরোধী শিবির। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। নিরাপত্তা ব্যর্থতা, একাধিক যুদ্ধ, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, গাজায় যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের মতো বিষয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থানে কিছু পার্থক্য থাকলেও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার দায় নির্ধারণ নিয়ে তাদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পদের অধিকাংশ প্রার্থীই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট পথ দেখাতে পারেননি। ইসরায়েলের দখলে থাকা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে ন্যায্য সমঝোতার রূপরেখাও তাদের প্রস্তাবে স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। ফলে ছোট দলগুলোর আসনও সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন
নেতানিয়াহুর বিদায়ী সরকারে থাকা পাঁচটি দল হলো লিকুদ, রিলিজিয়াস জায়নিস্ট–জেহুত জোট, ওৎজমা ইয়েহুদিত, শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে রয়েছে গাদি আইজেনকটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন টুগেদার (বিইয়াখাদ), ডেমোক্র্যাটস ও ইসরায়েল বেইতেনুর মতো রাজনৈতিক শক্তি। আরব দলগুলোও নির্বাচনি সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সরকার গঠনের সমীকরণ নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল ও দলগুলোর পারস্পরিক সমর্থনের ওপর।
জনমত জরিপে এগিয়ে আইজেনকটের দল
গত ১৪ দিনে জরিপ প্রকাশ করা ৯টি সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ জরিপের গড় অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বিদায়ী জোটের পাঁচটি দল নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে গড়ে ৫০ দশমিক ২টি আসন পেতে পারে। জরিপভেদে এ সংখ্যা ৪৬ থেকে ৫৮-এর মধ্যে। কোনো জরিপেই জোটটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পূর্বাভাস পায়নি।
জরিপের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম কয়েক সপ্তাহে বিদায়ী ক্ষমতাসীন জোটের গড় আসনসংখ্যা ছিল ৫১ দশমিক ৭। বর্তমানে তা কমে ৫০ দশমিক ২-এ দাঁড়িয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর দলগুলোর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার সময় এ গড় ছিল ৪৮ দশমিক ৯।
এদিকে ‘হারেদি পাবলিক’ নামের তালিকাটি যেসব জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই তা নেসেটে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ
অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনে প্রধান নেতাদের মধ্যে এ সমাধানের প্রতি সমর্থন সীমিত। নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। আইজেনকটও বলেছেন, দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ভুল।
ধর্মীয় জায়নবাদী দলের নেতা ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা বাতিল, অসলো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল এবং গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের অভিবাসনে উৎসাহ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সরাসরি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে পৌঁছানো কঠিন। তিনি বেসামরিক ক্ষেত্রে দুই জনগোষ্ঠীকে পৃথক করার পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের হাতে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
অতি-রক্ষণশীলদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ
অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবারের নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নেতানিয়াহু সরকার টিকিয়ে রাখতে শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজমের মতো ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করেন। দল দুটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা চায়।
আইজেনকটের মতে, এবারের নির্বাচন এমন একটি সরকারের মধ্যে বেছে নেওয়ার লড়াই, যারা কিছু গোষ্ঠীকে সামরিক নিয়োগ এড়ানোর সুযোগ দেয় এবং এমন সরকারের মধ্যে, যারা বাধ্যতামূলক নিয়োগের পক্ষে। ডানপন্থি দল ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যানের অভিযোগ, ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় নেতানিয়াহু সামরিক নিয়োগ এড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক।
বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে বিরোধ
২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর নেতানিয়াহুর সরকার বিচার বিভাগের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালে এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সরকারের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগও ছিল।
বিরোধী শিবিরের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট জানিয়েছেন, নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে তারা বিচার বিভাগ সংস্কারসংক্রান্ত আইন বাতিলের উদ্যোগ নেবেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বক্তব্য, নির্বাচিত সরকারের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে সংস্কার প্রয়োজন।
৭ অক্টোবরের হামলার তদন্ত
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও সময় নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় কার, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে। ওই হামলার পর ইসরায়েলি সেনাপ্রধান হারজি হালেভি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান রোনেন বারও ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব ছাড়েন।
আইজেনকটের অভিযোগ, হামলার আগাম সতর্কতা পেয়েও নেতানিয়াহু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি। তিনি ঘটনার তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, এমন একটি তদন্ত কমিশন চান, যার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন থাকবে। তবে তার সরকারের প্রস্তাবিত তদন্তব্যবস্থা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
