একজনের মতের সঙ্গে অন্যজনের মত মিলবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তো মতের মিলনে নয়, মতের অমিল নিয়েও পাশাপাশি থাকার ক্ষমতায়। যে সমাজে একটি বইয়ের বক্তব্যের জবাব অন্য বই দিয়ে দেওয়া যায়, সেই সমাজে চিন্তার পরিসর বেঁচে থাকে। আর যে সমাজে বইয়ের জবাব আসে লাঠি, ভাঙচুর কিংবা ভয় দেখিয়ে, সেখানে শুধু একটি রাজনৈতিক দল পরাজিত হয় না, পরাজিত হয় নাগরিক স্বাধীনতার ধারণাটিও।...

দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে নিছক ধর্মীয় আচার নয়। এ উৎসব ঘরে ফেরার, পরস্পরের কাছে আসার, পুরোনো অভিমান ভুলে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার। এ উৎসবে মণ্ডপে যেমন দেবীর আরাধনা হয়, তেমনই ফুটপাতে জমে ওঠে মানুষের মিলনমেলা। পুজোর কলকাতা তাই শুধু আলোর শহর নয়, মানুষের শহরও। সেখানে ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম, দল-মতনির্বিশেষে সবার প্রবেশাধিকার থাকার কথা। কিন্তু ২০২৬-এর দুর্গোৎসবের দিকে ফিরে তাকালে আনন্দের স্মৃতির পাশে এমন কিছু ছবি ভেসে উঠছে, যা পশ্চিম বাংলার বাঙালির বিবেককে রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এবার পঞ্জিকা অনুযায়ী সপ্তমী ছিল দুই দিন। তার প্রথম দিনে উত্তর কলকাতার চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থি বইয়ের স্টলে হামলা, ভাঙচুর ও উচ্ছেদ ঘিরে বিতর্ক। একটি ঘটনায় মানুষের প্রাণ গেছে, অন্যটিতে আক্রান্ত হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক পরম্পরা। ঘটনা দুটির চরিত্র এক নয়। কিন্তু তাদের পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে–উৎসবের নামে আমরা ঠিক কী রক্ষা করতে চাইছি, আর কী হারিয়ে ফেলছি?
চোরবাগানের দুর্ঘটনা কোনো পরিসংখ্যানমাত্র নয়। ১৯টি মৃত্যু মানে ১৯টি পরিবারে উৎসবের আলো নিভে যাওয়া। কারও হয়তো পুজোর কেনাকাটা সবে শেষ হয়েছিল। কেউ হয়তো বহু দিনের অপেক্ষায় পরিবারকে নিয়ে মণ্ডপ দেখতে বেরিয়েছিলেন। কোনো মা হয়তো সন্তানকে কথা দিয়েছিলেন, এবার বড় বড় পুজোমণ্ডপ দেখাবেন। কোনো বৃদ্ধের কাছে এই বেরিয়ে পড়াই ছিল বছরের বিশেষ আনন্দ। তাদের প্রত্যাবর্তন আর হলো না। বাড়ি ফিরল না তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচ্ছ্বাস, উল্টো ফিরল শোকের খবর।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে প্রবল ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ২৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বৃষ্টি, সংকীর্ণ প্রবেশ ও নির্গমনপথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং আতঙ্ক ছড়ানো পরিস্থিতি–সব মিলিয়ে কীভাবে এ বিপর্যয় ঘটল, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তদন্তের ফল প্রকাশের আগেই একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তা হলো যে উৎসবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, সেই উৎসবের জৌলুস কোনোভাবেই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
দুর্গাপুজো কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। মণ্ডপের সামনে দাঁড়ানো মানুষ ভোটার হওয়ার আগে মানুষ, দর্শনার্থী হওয়ার আগে নাগরিক। তাদের নিরাপত্তাকে দলীয় মর্যাদা, প্রচার কিংবা ক্ষমতার প্রদর্শনের চেয়ে ছোট করে দেখার অধিকার কারও নেই। চোরবাগানের মৃত্যুমিছিল তাই কেবল একটি পুজো কমিটির ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের উৎসব পরিচালনার সামগ্রিক সংস্কৃতি নিয়ে আত্মসমীক্ষার দাবি জানায়। যা ঘটেছে, তা আসলে অন্য এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দেয়। বামপন্থিদের অভিযোগ, বিজেপি-সমর্থিত বা দক্ষিণপন্থিরা এই শোকের মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থি বইয়ের স্টল ভাঙচুর, আক্রমণ এবং উচ্ছেদ করেছে। একাধিক জায়গায় তাদের বইয়ের স্টলকে নিশানা করেছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব অবশ্য দলীয় নির্দেশে এমন হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অতএব, প্রতিটি ঘটনার দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক দায় নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না–তা হলো পুজোর ময়দানে বইয়ের জায়গা কি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।
বাংলার দুর্গোৎসবের একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্র রয়েছে। পুজোমণ্ডপের পাশে বইয়ের স্টল, লিটল ম্যাগাজিনের টেবিল, কবিতার বই, রাজনৈতিক পুস্তিকা, সাহিত্যচর্চা–এসব কোনো বিচ্ছিন্ন সংযোজন নয়। এগুলো বহু বছর ধরেই বাঙালির উৎসবজীবনেরই অংশ। যে মানুষটি দেবী দর্শনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ান, তিনিই হয়তো ফেরার পথে কিনে নেন কবিতার বই। যে কিশোরটি বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘোরে, সে-ই হয়তো কোমর দেনকের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয় একটি ছোট বইয়ের স্টলে। পুজোর এই অবকাশে মানুষ শুধু প্রতিমা দেখে না, নিজের পরিচিত চিন্তার গণ্ডির বাইরেও উঁকি দেয়।
বইয়ের স্টলকে তাই কেবল একটি দলের প্রচারের জায়গা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কোনো স্টলে মার্কস-লেনিনের বই বিক্রি হতে পারে, অন্য কোথাও গান্ধী, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আম্বেদকরের লেখা। একজনের মতের সঙ্গে অন্যজনের মত মিলবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তো মতের মিলনে নয়, মতের অমিল নিয়েও পাশাপাশি থাকার ক্ষমতায়। যে সমাজে একটি বইয়ের বক্তব্যের জবাব অন্য বই দিয়ে দেওয়া যায়, সেই সমাজে চিন্তার পরিসর বেঁচে থাকে। আর যে সমাজে বইয়ের জবাব আসে লাঠি, ভাঙচুর কিংবা ভয় দেখিয়ে, সেখানে শুধু একটি রাজনৈতিক দল পরাজিত হয় না, পরাজিত হয় নাগরিক স্বাধীনতার ধারণাটিও।
বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে কারও বিরোধ থাকতে পারে। তাদের অতীত, বর্তমান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা মতাদর্শ নিয়ে কঠোর সমালোচনা হতেই পারে। বরং একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে সেই সমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বিরোধিতা আর প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা এক নয়। কোনো বইয়ের বক্তব্য ভুল মনে হলে তার প্রতিবাদ করুন, পাল্টা বই প্রকাশ করুন, বিতর্কের আয়োজন করুন। পাঠককে বোঝান কেন আপনি দ্বিমত পোষণ করছেন। কিন্তু বইয়ের স্টল ভেঙে দিলে, বই সরিয়ে দিলে কিংবা বিক্রেতাকে ভয় দেখালে নিজের মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। উল্টো নিজের যুক্তির ওপর আস্থার অভাবই প্রকাশ পায়।
এখানে বিজেপির প্রতি প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ আক্রান্ত স্টলগুলোকে ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এই দলের সমর্থক বলে অভিযুক্ত কয়েকটি গোষ্ঠী। অভিযোগ অস্বীকার করা রাজনৈতিক দলের অধিকার। কিন্তু অভিযোগ অস্বীকার করাই যথেষ্ট নয়। দলের নামে বা দলের আদর্শের দোহাই দিয়ে কেউ যদি হামলা চালিয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া এবং তদন্তে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনেরও কর্তব্য, অনুমতির নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। একটি স্টল অনুমতি না থাকায় সরানো হলে, একই পরিস্থিতিতে অন্য স্টলকে ছাড় দেওয়া যাবে না। আইনের নিরপেক্ষতা না থাকলে প্রশাসনিক পদক্ষেপও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে সন্দেহের জন্ম দেয়।
বাংলার সংস্কৃতি কখনো একরঙা ছিল না। তার ভিতর রয়েছে ভক্তি ও যুক্তি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবোধ, আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদ, বহু ধারার সহাবস্থান। রবীন্দ্রনাথকে পড়তে গিয়ে যেমন বিবেকানন্দকে অস্বীকার করতে হয় না, তেমনই দুর্গার আরাধনা করতে গিয়ে মার্কসের বই সরিয়ে ফেলতে হয় না। একটি সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয় তার বহুত্বকে ধারণ করার ক্ষমতায়। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় মানুষকে অন্যের বই দেখে ভয় পেতে হয় না।
বইয়ের স্টলের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, আক্রান্তদের নিরাপত্তা এবং অনুমতি-সংক্রান্ত নিয়মের স্বচ্ছ প্রয়োগ। রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনকে দেখাতে হবে, একটি বইয়ের দোকান বা পুস্তিকা বিক্রির টেবিল কোনো ক্ষমতাবানের অনুগ্রহে বেঁচে থাকে না; আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারেই তার অস্তিত্বের ভিত্তি।
পুজোর আলো নিভে যায়। মণ্ডপ খুলে যায়। প্রতিমা বিসর্জনের জলে মিশে যায় কয়েক দিনের উল্লাস। কিন্তু একটি সমাজের বিবেকের পরীক্ষা শেষ হয় না দশমীর সন্ধ্যায়। বরং তখনই বোঝা যায়, উৎসব আমাদের কতটা মানুষ করে তুলল।
বাংলা কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে? উত্তর নির্ভর করছে আমাদের ওপরেই। আমরা মৃত্যুকে নিছক দুর্ভাগ্য বলে ভুলে যাব, না কি তার থেকে শিক্ষা নেব? বইয়ের স্টল ভাঙার খবরকে দলীয় সংঘর্ষ বলে এড়িয়ে যাব, না কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখব। উৎসবের প্রকৃত জয় তখনই, যখন দেবীর বিদায়ের পরও মানুষের প্রতি মানুষের দায়টুকু অটুট থাকে। কারণ, শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় মণ্ডপটি ইট-কাঠ-বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় না। তার নাম সমাজ। আর সেই সমাজের ভিত যদি নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও মানবিকতার ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে, তবে যতই আলো জ্বলুক, অন্ধকার থেকেই যায়।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
