পবিত্র কোরআনের সুরা আসর শুরু হয়েছে সময়ের শপথ দিয়ে। এতে বলা হয়েছে, মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে, তারা এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া সুরা ফজর, সুরা লাইল ও সুরা দুহাসহ কয়েকটি সুরার শুরুতেও দিন বা রাতের কোনো বিশেষ সময়ের শপথ করা হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাত ও দিনকে বছর গণনা এবং সময়ের হিসাব জানার উপায় হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
সময় সম্পর্কে সুরা আসরের বর্ণনা
সুরা আসরের শুরুতে সময়ের শপথ করা হয়েছে। সুরা আসরের ১ থেকে ৩ নম্বর আয়াতের সহজ অর্থ হলো— সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।
এই তিন আয়াতে মানুষের সফলতার জন্য চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো—ঈমান, সৎকাজ, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া এবং একে অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া।
তাফসির ইবনে কাসিরের এসব শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আসর বলতে এমন সময়কে বোঝানো হয়েছে, যখন আদমসন্তানের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়—তা ভালো হোক কিংবা মন্দ। তবে মালিক ইবনে আনাস, যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আসর বলতে সন্ধ্যাকাল বোঝানো হয়েছে। তাফসিরে অবশ্য প্রথম মতটিকেই অধিক প্রচলিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষতি সম্পর্কে তাফসিরে বলা হয়েছে, আল্লাহ শপথ করে জানিয়েছেন যে, মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। এখানে ক্ষতি বলতে লোকসান ও ধ্বংস বোঝানো হয়েছে। আর পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা।
এই সুরা সম্পর্কে তাফসিরে ইমাম শাফেয়ির একটি বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মানুষ যদি এই সুরা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তাহলে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।
এ ছাড়া তাবারানি আবদুল্লাহ ইবনে হুসন আবু মদিনার সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবিদের মধ্যে দুজনের সাক্ষাৎ হলে তারা পরস্পর থেকে বিদায় নেওয়ার আগে একজন অন্যজনকে পুরো সুরা আসর পড়ে শোনাতেন এবং একে অন্যকে সালাম দিতেন।
দিনের বা রাতের বিশেষ সময়ের শপথ দিয়ে শুরু হয়েছে যেসব সুরা
সুরা আসরের মতো আরও কয়েকটি সুরার শুরুতে দিনের বা রাতের বিশেষ সময়ের শপথ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুরা ফজর, সুরা লাইল ও সুরা দুহা।
সুরা ফজর
সুরা ফজরের প্রথম দুই আয়াতে বলা হয়েছে— শপথ ভোরবেলার। আর শপথ দশ রাতের।
সুরা লাইল
সুরা লাইলে বলা হয়েছে— শপথ রাতের, যখন তা আচ্ছন্ন করে। আর শপথ দিনের, যখন তা প্রকাশিত হয়।
সুরা দুহা
সুরা দুহার প্রথম দুই আয়াতে বলা হয়েছে— শপথ পূর্বাহ্নের উজ্জ্বল আলোর। আর শপথ রাতের, যখন তা অন্ধকারে ঢেকে যায়।
সময়ের হিসাব নির্ধারণে রাত ও দিন সম্পর্কে যা বলেছে কোরআন
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাত ও দিনের আবর্তন এবং সূর্য ও চাঁদের গতিপথকে সময়ের হিসাব নির্ধারণের উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সুরা ইসরার ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— আমি রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন বানিয়েছি। অতঃপর রাতের নিদর্শনকে মুছে দিয়েছি এবং দিনের নিদর্শনকে দৃশ্যমান করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারো এবং বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। আর আমি সবকিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।
সুরা ইউনুসের ৫ নম্বর আয়াতেও সূর্য ও চাঁদের প্রসঙ্গে একই বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনিই সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময় এবং চাঁদকে আলোকময় করেছেন। চাঁদের জন্য বিভিন্ন মনজিল নির্ধারণ করেছেন, যাতে মানুষ বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে।
এ ছাড়া সুরা নাবার ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ রাতকে করেছেন আবরণ এবং দিনকে করেছেন জীবিকা অর্জনের সময়।
সুরা ফুরকানের ৬২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পরের পরপর আগমনকারী করেছেন, তাদের জন্য, যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় অথবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়।
নামাজ ও দিনের বিভিন্ন সময় সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশনা
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সময়ের সঙ্গে ইবাদতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। সুরা নিসার ১০৩ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ করা হয়েছে।
দিনের বিভিন্ন সময়ের নামাজ সম্পর্কে সুরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করতে।
সুরা ইসরার ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করতে এবং ফজরের কোরআন তিলাওয়াত করতে। নিশ্চয়ই ফজরের তিলাওয়াত প্রত্যক্ষ করা হয়।
আরও পড়ুন
সুরা ত্বহার ১৩০ নম্বর আয়াতে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সূর্যোদয়ের আগে, সূর্যাস্তের আগে, রাতের বিভিন্ন সময়ে এবং দিনের প্রান্তভাগে আল্লাহর প্রশংসাসহ তার পবিত্রতা ঘোষণা করতে বলা হয়েছে, যাতে মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারে।
এই আয়াতগুলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিয়ে মুফাসসিররা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
কাজ ও কাজ শেষে করণীয় সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে জুমার নামাজ, কাজ শেষ করার পর করণীয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুরা জুমার ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— হে মুমিনরা, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটি তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।
সুরা ইনশিরাহর ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন তুমি একটি কাজ থেকে অবসর পাও, তখন অন্য কাজে আত্মনিয়োগ করো।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে সুরা আল ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, যখন তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। এই আয়াতে মূলত পরামর্শ গ্রহণের প্রেক্ষাপটে মহানবীকে (সা.) সম্বোধন করা হয়েছে।
এনটি
