নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) বিলম্বজনিত পাওনা জনপ্রতি ৩৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীরা। তবে জনপ্রতি প্রায় ১০ কোটি টাকা পেলে এই পাওনার দাবি থেকে সরে আসবেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
পাওনা নিষ্পত্তির দাবিতে আজ সোমবার রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকম ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিতে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীরা এসব কথা বলেন। গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আবু সাঈদ মো. শোয়েব বলেন, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে পাওনা আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তাঁরা। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া, মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং আলোচনার আহ্বান জানালেও এখনো দাবির কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি।
সাবেক কর্মীরা জানান, ঐক্য পরিষদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) আইন শাখা গত ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ককে চিঠি দেয়। চিঠিতে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে একাধিক মামলা চলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় পক্ষের সম্মতি এবং আদালতের প্রয়োজনীয় অনুমতি সাপেক্ষে সালিস বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ায় বিরোধ মেটানোর পরামর্শ দিয়েছে বিটিআরসি।
ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, বিটিআরসির এই লিখিত পরামর্শ বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনায় বসা এবং নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা জরুরি।
পাওনা আদায়ে দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে সাবেক কর্মীদের সাতজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির দাবি, তাঁরা জীবদ্দশায় পাওনা নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেননি। তাঁদের পরিবারের কাছে দীর্ঘদিনের এই অপেক্ষা স্বজন হারানোর বেদনাও বাড়িয়েছে। মানববন্ধনে গায়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে প্রতীকী লাশ নিয়ে পাওনা নিষ্পত্তির দাবি জানান সাবেক কর্মীরা।
সাবেক কর্মী শাকিলা মালেক বলেন, প্রতিটি দাবির সঙ্গে শ্রমিকের পরিশ্রম, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং বহু বছরের প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে। প্রয়াত সহকর্মীদের পরিবারের দাবিসহ জীবিত কর্মীদের পাওনা নিষ্পত্তিতে দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঐক্য পরিষদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দাবিকৃত ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ চাইছেন তাঁরা। সংগঠনটির হিসাবে, এই অর্থের পরিমাণ ৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি টাকা। বিরোধ নিষ্পত্তি হলে কর ও সংশ্লিষ্ট রাজস্ব বাবদ সরকারের সম্ভাব্য আয় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে সংগঠনটি। তবে এসব অঙ্ক ঐক্য পরিষদের নিজস্ব দাবি ও হিসাব। সংশ্লিষ্ট নথি, হিসাব এবং প্রযোজ্য বিধান যাচাই করে চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
ঐক্য পরিষদের অভিযোগ, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ এবং গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডার গ্রামীণ টেলিকমের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও সমন্বিত ও দৃশ্যমান সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায়নি। গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদকে গ্রামীণফোনের সঙ্গে আলোচনা করে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সক্রিয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ। একই সঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দেওয়া স্মারকলিপির বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রগতি জানাতে বলেছে সংগঠনটি।
মানববন্ধনে ছয়টি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে—২০১০ থেকে ২০১২ সালের শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল-সংক্রান্ত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত পাওনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত নিষ্পত্তি; বিটিআরসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া পদক্ষেপ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান প্রকাশ; আদালতের প্রয়োজনীয় অনুমতি সাপেক্ষে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ; উভয় পক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের আলোচনার সময়সূচি ঘোষণা; নথির ভিত্তিতে পাওনা ও সম্ভাব্য সরকারি রাজস্বের হিসাব যাচাই এবং প্রয়াত সাত সহকর্মীর পরিবারের দাবিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মীর বিষয় নিষ্পত্তির আওতায় আনা।
ঐক্য পরিষদ বলেছে, তারা আর অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে চায় না। আলোচনার নির্দিষ্ট তারিখ, নিষ্পত্তির সময়সূচি এবং বাস্তব অগ্রগতি জানাতে হবে। ন্যায়সংগত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঐক্য পরিষদ।
এ বিষয়ে একাধিকবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্রামীণফোন জানিয়েছে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। আইনি প্রক্রিয়াতেই এর সমাধান হবে।

