মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সোমবারের এই বৈঠকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিণতি, ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি, লেবাননের পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন করে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার ইরানে তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করে বলেছেন, ‘আজ কোনো হামলা
হবে না।’ তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুই দেশকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটটির দাবি, হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের পাঁচটি সুড়ঙ্গ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের চারটি প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি আরবে হুথিদের হামলার জবাবে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে জোটটি। একই সময়ে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে মিশরের পার্লামেন্ট।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপসচিব আলী বাঘেরি কানি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন তেহরান সফর করবেন। সেখানে তারা ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, বৈঠকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। আলোচনায় ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি, লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন যুদ্ধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বাঘেরি কানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ বৈঠক হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।
বাঘেরি কানির ভাষ্য, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। এর মাধ্যমে বিদেশি হস্তক্ষেপনির্ভরতা কমিয়ে একটি স্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেছেন, গত দুই বছরে, বিশেষ করে গত আট মাসের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে যে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তেহরান বৈঠকে দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রতিনিধি দল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ির সঙ্গেও বৈঠক করবে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলোর কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠী গত মাসে সৌদি আরবে হামলা জোরদার করার পর ইরানের সঙ্গে এ তিন দেশের প্রতিনিধিদের এটি প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে কাতার। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রবিবার সন্ধ্যায় কাতারের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছায়।
আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি ঠেকানো এবং চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগ এগিয়ে নেওয়াই কাতারের প্রতিনিধি দলের সফরের উদ্দেশ্য।
সূত্রটি জানায়, ইরান এরই মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের অবস্থান ও দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। চলমান সংঘাতের পুরো সময়জুড়েই কাতার ও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরিতে কাজ করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ব্যাপারে আন্তরিক না হলেও ইরান কূটনীতির পথ বন্ধ করেনি।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো হবে কিনা, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের মধ্যে রবিবার ট্রাম্প তাৎক্ষণিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ কোনো হামলা হবে না।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমার কোনো নিশ্চিত লক্ষণ নেই। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুই দেশকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। মিশরের রাজধানী কায়রো সফরকালে সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ সংযম ও কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।’ গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে যে হুমকি ও পাল্টা হুমকি চলছে, তা যদি বড় ধরনের পারস্পরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও জোরদার করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দেওয়া এই জোটের দাবি, সৌদি আরবের ভেতরে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে হুথিদের সক্ষমতা কমাতে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণব্যবস্থায় আঘাত হানা হয়েছে।
জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত পাঁচটি সুড়ঙ্গ এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের চারটি প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করা হয়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গুদামেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে মিসরের পার্লামেন্ট। এর ফলে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতে কায়রো সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গত সপ্তাহে সৌদি আরবকে হুথিদের হামলা থেকে রক্ষায় সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টের অনুমোদন চান। হুথিদের অগ্রযাত্রা কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির জন্যও হুমকি তৈরি করছে। এ প্রণালি মিসরের সুয়েজ খালের সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশদ্বার।
আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিসরের মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী রয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিল দেশটি। তখন মূলত নৌবাহিনীর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় ৮০০ স্থলসেনাও মোতায়েন করেছিল মিশর, যদিও সরাসরি যুদ্ধে তাদের ভূমিকা সীমিত ছিল। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মিশর বড় পরিসরে বিদেশে স্থলসেনা মোতায়েন করেনি।
