সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় কোনো বীরত্ব নেই। বরং এখানে রয়েছে উগ্রতা, সংকীর্ণতা ও কাপুরুষতা। ধর্ম ও রাজনীতি এমন ঘৃণ্য বিষয়কে সমর্থন করতে পারে না। অথচ ভারতের মত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা বহু পুরানো, এখন আবার শুরু হয়েছে খৃস্টান নির্যাতন। অথচ ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনের কথা বর্ণিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের উগ্রতা চোখে পড়ার মতো। সম্প্রতি তিনটি খৃস্টান পরিবারের ওপর নেমে আসা অকথ্য পাশবিকতা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বড় প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। নির্যাতিত পরিবারগুলো অভিযোগ করেছে, পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা এলাকায় গত ৩০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন তারা। প্রায় ১৮ মাস আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করায় এখন তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। গত ১৮ ও ১৯ অক্টোবর তাদের ওপর হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের সদস্যরা। খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ না করলে পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণেরও হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ভয় দেখিয়ে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগে চাপ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ৪০ বছর বয়সি লক্ষ্মী মণ্ডল পশ্চিম মেদিনীপুরের পাটলাপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করছিলেন। এ সময় ১০ জনের অধিক লোক তার বাড়িতে ঢুকে পড়েন, যাদের মধ্যে তিনজন নারীও ছিলেন। লক্ষ্মী মণ্ডলের ভাষ্য, হামলাকারীরা পাশের গ্রামের বাসিন্দা এবং বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত। তারা তাকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। এ সময় তাকে চড় মারা হয় এবং মাথা ও কানের নিচে আঘাত করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি বুঝতে পারেন, হামলাকারীরা তার পোশাক ছিঁড়ে বিবস্ত্র করার চেষ্টা করছে। এ সময় তাকে জোর করে গোসল করিয়ে ‘হিন্দু শুদ্ধিকরণ’ আচার পালনে বাধ্য করা হয়। ভুক্তভোগী ওই তিনটি পরিবারের ৯ জন সদস্য থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিলেও, পরিবারগুলো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবে এ ঘটনায় কোনো মন্তব্য করেন নি জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরেই খৃস্টানদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বঙ্গীয় খৃস্টীয় পরিষেবা (বিসিপি)-এর মতো খৃস্টান অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো রাজ্য প্রশাসনের ওপর ভরসা হারিয়ে সরাসরি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের ভিত্তিহীন ও ভুয়া অভিযোগ এনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গির্জায় হামলা, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং প্রার্থনাসভায় ঢুকে মারধরের ঘটনা এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর রাজ্য সরকার এ ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ। প্রশ্ন, এই ব্যর্থতার পরিণাম কেমন হবে?
