রাজধানীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ৫৪৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকা তৈরি করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। তবে তালিকা ধরে অভিযান চালাতে গিয়ে আইনি জটিলতায় পড়ছে পুলিশ ও এসআরবি। গ্রেপ্তারের পর কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে- এ নিয়ে দেখা যাচ্ছে জটিলতা। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির নতুন কোনো মামলা নেই, তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে সংকটে পড়ছে পুলিশ। এমন প্রেক্ষাপটে তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করা যায় কিনা তার আইনি সম্ভাবতা খতিয়ে দেখছে সরকার। এ ধরনের উদ্যোগের আইনি ভিত্তি, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, সরকারের নির্দেশ পেলে পুলিশ বাদী হয়ে বাংলাদেশ দ-বিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে। বিশেষ করে যাদের নাম তালিকায় রয়েছে এবং চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পাচ্ছে না, তখন পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
জানা গেছে, ৫৪৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকার একটি বড় অংশই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। ফলে তারা চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকলেও ভুক্তভোগীরা চাঁদাবাজির মামলা করতে ভয় পান। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া তালিকাভুক্তদের কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। আবার কারও কারও সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালীদের সখ্য রয়েছে। এতে তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারে দ্বিধায় পড়ছেন মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনাকারীরা। পরবর্তী সময়ে বিপদে বা রোষানলে পড়ার ভয় পাচ্ছেন পুলিশের কেউ কেউ। আবার গ্রেপ্তারের
পর চাঁদাবাজির মামলা না থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে জটিলতায় পড়ছেন। ফলে তাদের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে তারা জামিনে বেরিয়ে আসছেন।
গত ৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়। ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরদিন তাকে এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের করা পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন তিনি জামিন পান আদালত থেকে। সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকার কারণেই তাকে জামিন দেন আদালত।
চাঁদাবাজির অভিযোগে ৪ অক্টোবর খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহিনুর আলম মারফতকে আটক করে এসআরবি-১। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। চাঁদাবাজদের তালিকায় তার নাম ছিল। কিন্তু মামলা না থাকায় তার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা নিয়ে সংকটে পড়ে পুলিশ। পরবর্তীকালে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারের দুই দিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাসুম খান রাজেশকে রবিবার রাতে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার জিয়াউদ্দিন আহমেদ গতকাল বিকালে আমাদের সময়কে বলেন, আটক করা ওই বিএনপি নেতাকে মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর থানায় যোগাযোগ করা হলে থানার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, চাঁদাবাজির মামলা না থাকায় রাজেশকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা ঘটলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করার সুযোগ নেই। শুধু তালিকায় নাম থাকার ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে পরে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়কে অবহিত করা হয়েছে। যার ফলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার দিকটিও ভাবছে সরকার।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন আমাদের সময়কে জানান, তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের যেসব নেতাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির নতুন মামলা পাওয়া যাচ্ছে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রুজু করা মামলা পাওয়া গেলেও গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট নেতা দাবি করছেন- রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই তৎকালীন সরকার চাঁদাবাজির মামলা দিয়েছিল। ফলে ওই সব মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সন্দেহভাজন চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করাই শেষ কথা নয়; তালিকার তথ্য যাচাই করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে- তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই, মামলা ও গ্রেপ্তারের আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে অভিযান পরিচালনা করা।
সূত্র জানায়, বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ঢাকার ফুটপাত, বাজার ও টেম্পোস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক সন্দেহভাজন ১২শ চাঁদাবাজের একটি তালিকা করে অভিযান শুরু করা হয়। সর্বশেষ এই ৫৪৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকা করা হয়। যে তালিকা ধরে এখন অভিযান চলছে। তালিকায় ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তেজগাঁও বিভাগে। বিভাগভিত্তিক তালিকায় তেজগাঁওয়ে ১৫৫, গুলশানে ৮৫, উত্তরায় ৭২, লালবাগে ৭১, মিরপুরে ৬৬, রমনায় ৫০, ওয়ারীতে ২৪ এবং মতিঝিলে ২২ জনের নাম রয়েছে।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ৭৫ জনের সঙ্গে বিএনপি বা এর সহযোগী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকার বাকি ১৩৪ জনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট ছয়জনের মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দুজন সাবেক পুলিশ সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
