চলতি বছর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। তবে এই হিসাবের অর্থ এই নয় যে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে বড় কিংবা বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় এই অগ্রগতি এখন চাপে রয়েছে।
মাথাপিছু জিডিপি কী?
একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে জিডিপি বলা হয়। এই মোট উৎপাদনকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ধারণা দেয়, তবে প্রত্যেক নাগরিকের প্রকৃত আয় বা জীবনযাত্রার মান সরাসরি বোঝায় না।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়।
ক্রয়ক্ষমতায় এগিয়ে ভারত
মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাবে ভারত এগিয়ে। স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিলে ২০২৬ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হিসাব ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার।
অর্থাৎ ডলারে মাথাপিছু জিডিপি বেশি হলেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি হবে, এমন নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্থানীয় বাজারে পণ্য-সেবার দামও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে তা হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর অর্থ, বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে ভারত
মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভারতের গতি বেশি। ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আগামী কয়েক বছরেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি স্থায়ী নাও হতে পারে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলার এবং ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলার হতে পারে। ২০২৯ সালে ভারত ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।
বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে কী রয়েছে?
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্প রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের বিস্তারও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে।
ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। দেশটির প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প, কৃষি এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে শক্তিশালী করেছে।
ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও দীর্ঘ মেয়াদে কমেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
অগ্রগতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়ে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় এই শিল্পের পণ্য পরিবহনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
