ছবির ক্যাপশন: .
রিপোর্টার, রায়হান শরীফ
সীমান্তে অব্যাহত হত্যা ও জোরপূর্বক ‘পুশ-ইন’, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে অনিশ্চয়তা এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ অমীমাংসিত রেখে ভারতের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোর ও একপাক্ষিক আঞ্চলিক প্রকল্পসমূহে সায় না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সংগঠন ‘জানা – জাতীয় স্বার্থে নাগরিক’ (CNI)। আজ ঢাকা প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব দাবি ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে সংগঠনটির পক্ষে বলা হয়, আসাম-বাংলাদেশ-বিহার বিদ্যুৎ করিডোর প্রকল্প, উজান-ভাটির পানি চুক্তি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ট্রানজিটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সার্বিক নিরাপত্তা ও জনগণের অংশগ্রহণ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। সংসদীয় অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও জনসম্পৃক্ততা ছাড়া যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা চুক্তি বাতিল করার দাবি জানান তারা।
সীমান্তে পুশ-ইন ও রক্তপাত বন্ধের জোর দাবি:
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সীমান্তে বিদ্যমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) কোনো বিচারিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতীয় নাগরিকেও পরিণত হওয়া ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা পুশ-ইন করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে শত শত বেসামরিক মানুষকে এভাবে সীমানা পার করানো হয়েছে। একই সাথে সীমান্তে বন্দুকযুদ্ধের নামে প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালেই বিএসএফের হাতে অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সীমান্ত অবকাঠামো বা করিডোর চুক্তি প্রক্রিয়া এগোতে পারে না।
৭১৬ কেভি বিদ্যুৎ করিডোর ও জাতীয় ঝুঁকি:
প্রস্তাবিত কাটিনহার (বিহার)–পার্বতীপুর (বাংলাদেশ)–বর্নগর (আসাম) ৭১৬ কিলোভোল্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোর সম্পর্কে সিএনআই জানায়, এই বিদ্যুৎ করিডোরের সিংহভাগ জমি ও সার্বভৌম ক্ষেত্র ব্যবহৃত হবে বাংলাদেশে, অথচ এর বিদ্যুৎ-নিয়ন্ত্রণ ও সুফল যাবে ভারত, নেপাল বা ভুটানের একচ্ছত্র কাঠামোর অধীনে। বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, যেখানে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের ওপর দেশের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, সেরকম সামরিক বা আধা-সামরিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে কীভাবে বাংলাদেশ সম্মতি দিতে পারে? তারা দাবি করেন, এই করিডোরের অধীন যেকোনো গ্রিড বা অবকাঠামোর ওপর বাংলাদেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও নিয়ন্ত্রণ অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।
পানি ও নদী-অধিকার: তিস্তা ও গঙ্গার ঐতিহাসিক শিক্ষা:
নদী ও পানি চুক্তি নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে সিএনআই নেতৃবৃন্দ বলেন, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি পাওয়ার ন্যায্য অধিকার থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ প্রায় শেষ হতে চললেও বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত পানি পায়নি। একইভাবে ২০১১ সালে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও তিস্তা চুক্তি আজও আলোর মুখ দেখেনি। গঙ্গা, তিস্তা বা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কোনো সমাধান না করে এবং শুকনো মৌসুমে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের ৩০ মিলিয়ন মানুষের চরম পানিসংকট উপেক্ষা করে একতরফা বিদ্যুৎ বা ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এমনকি ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নেপালে হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ভারতের উজান অংশ কোনো আগাম সতর্কবার্তা বা তথ্য বিনিময় করে না।
অসম সংযোগ ও ভূ-কৌশলগত বার্তা:
সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত ভারতকে নৌপথ, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং সড়ক পথ ব্যবহারের অবাধ ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে আসছে। অথচ নেপাল বা ভুটানের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ভারতের ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে মাত্র ১৭ থেকে ২২ কিলোমিটারের পথ ব্যবহারে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সিএনআইয়ের দাবি— ভারতের নিজস্ব কৌশলগত সুরক্ষার চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হলেও, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ন্যায্য অংশীদারিত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
জাতীয় স্বার্থে ৭ দফা দাবি:
সংবাদ সম্মেলন থেকে সিএনআই সরকারের নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে মূলত ৭টি দাবি উপস্থাপন করে:
১. সীমান্ত নিরাপত্তা: সীমান্তে পুশ-ইন ও অনভিপ্রেত হত্যা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত করিডোর স্থাপন বন্ধ রাখতে হবে।
২. বিদ্যুৎ করিডোরে অধিকার: বিদ্যুৎ করিডোর হলে তাতে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও চীনের সরাসরি অংশগ্রহণ ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত রাখতে হবে।
৩. সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা: ভূখণ্ডের ওপর বাংলাদেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বহাল রেখে কেবল বাণিজ্যিক চুক্তি হতে পারে; কোনো বিদেশী সামরিক/আধা-সামরিক উপস্থিতি মানা হবে না।
৪. পানি ও পরিবেশ: গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও অববাহিকাভিত্তিক সঠিক নদী-প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. জনমত ও সংসদীয় অনুমোদন: বিদ্যুৎ ও ট্রানজিটের সকল প্রকল্প পরিবেশগত ও কৌশলগত মূল্যায়ন শেষে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন ও জনসম্মুখে প্রকাশ করে অনুমোদন নিতে হবে।
৬. ন্যায্য ট্রানজিট মাশুল: ট্রানজিট ফি, সড়ক সুরক্ষা ও অবকাঠামোগত রাজস্বে বাংলাদেশকে ন্যায্য অংশীদারিত্ব দিতে হবে।
৭. বহুমুখী আঞ্চলিক সংযোগ: হিমালয়-বঙ্গোপসাগর উন্নয়ন পরিষদ গঠনের মাধ্যমে চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারতের সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক ও পেশাজীবী সমাজকে দেশের ভূমি, পানি, বিদ্যুৎ ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
