নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশের নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সারাদেশে এ কার্যক্রমের আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। নতুন ব্যবস্থায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খাদ্য আমদানিকারক ও সংরক্ষণাগারসহ নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসায় বিনামূল্যে নিবন্ধন নিতে হবে। পাশাপাশি বিশেষায়িত চার শ্রেণির খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা। তবে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার তথ্যভান্ডার তৈরি এবং নজরদারি বাড়ানোর
এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা। তাদের আশঙ্কা, বিদ্যমান তদারকিব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না করে নতুন বিধিমালা বাস্তবায়ন করা হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হওয়ার বদলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ঘুষের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এরপর ২১ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের জন্য আবেদন করার আহ্বান জানায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবা, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত ও মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনসহ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনের বিভিন্ন কার্যক্রমও প্রবিধানমালার আওতায় এসেছে।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট চার শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য, নিউট্রাসিউটিক্যালস এবং অনুরূপ খাদ্যপণ্য। এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বা রোগের ঝুঁকি হ্রাসের দাবি-সম্পন্ন নির্ধারিত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবিধানমালার তফসিল-১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। নিবন্ধনের জন্য ফরম ৫.১ এবং লাইসেন্সের জন্য প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১-এ আবেদন দাখিল করতে হবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর। মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, প্রাথমিক নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি লাগবে না। আবেদন পাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে। একসঙ্গে দেশের সব খাদ্য ব্যবসায়ীকে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব না হলেও এ কার্যক্রম সারাদেশে পরিচালিত হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জেলা ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করা হবে। ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম ডাউনলোড করা যাবে। অনলাইন ও অফলাইন- উভয় পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ থাকবে।
চেয়ারম্যান বলেন, ছোট-বড় দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধনই যথেষ্ট; সবার জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক নয়। তবে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত নির্ধারিত ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নিতে হবে।
বিএসটিআইয়ের সনদ থাকলেও খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন নিতে হবে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মূলত পণ্যের মান যাচাই করে। অন্যদিকে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্য ব্যবসায়ীদের তথ্য সংরক্ষণ ও তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম তদারকির জন্য নিবন্ধন দেবে। ফলে দুটি কার্যক্রমের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই।
নিবন্ধনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, খাদ্য ব্যবসায়ীদের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে। কোনো খাবার খেয়ে কেউ অসুস্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করাও সহজ হবে।
নিবন্ধনের নামে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার আহ্বান জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, এজন্য কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীরা আবেদন করলে এবং তাদের তথ্য সঠিক থাকলে নিবন্ধন পাবেন। এক্ষেত্রে অযথা হয়রানি বা জটিলতার সুযোগ নেই।
নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া : নিবন্ধন বিনামূল্যে হওয়ায় উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন আগারগাঁওয়ের একটি ভাতের হোটেলের মালিক জব্বার মিয়া। তবে ভবিষ্যতে এ জন্য ফি আরোপ করা হলে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
জব্বার মিয়া বলেন, ‘নিবন্ধন করতে যেহেতু কোনো টাকা লাগবে না, তাহলে আমার আপত্তি নেই। তবে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার পর আবার এই নিবন্ধনের জন্য টাকা দিতে হইলে ব্যবসা কেমনে করব।’
খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ভোক্তারাও। তবে তাদের মতে, শুধু নিবন্ধন নয়, খাবারের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও পরীক্ষা জরুরি।
রাজধানীর একটি হোটেলে খেতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী আল শাহরিয়া বলেন, বাইরে খেলে খাবার কতটা নিরাপদ, তা বোঝার উপায় থাকে না। অনেক সময় হোটেলের পরিবেশ ভালো মনে হলেও খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ থাকে। সব হোটেল নিবন্ধনের আওতায় এলে এবং নিয়মিত তদারকি করা হলে খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তবে শুধু নিবন্ধন দিলেই হবে না, নিয়মিত খাবারের মানও পরীক্ষা করতে হবে।
আপাতত নিবন্ধনের বাইরে ভ্রাম্যমাণ দোকান : প্রাথমিক পর্যায়ে স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে এবং বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন- এমন ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। রাস্তা দখল করে বা একেক দিন একেক স্থানে ভ্রাম্যমাণভাবে ব্যবসা করেন, এমন ব্যক্তিদের এখনই নিবন্ধন দেওয়া হবে না। স্থায়ী ঠিকানা না থাকলে অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হবে। তবে ভবিষ্যতে সরকার তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করলে পর্যায়ক্রমে এ ধরনের ব্যবসায়ীদেরও নিয়মের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩১ ও ৩৯ ধারা অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হবে। দীর্ঘ সময় পরও যারা নিবন্ধন করবেন না বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক ড. মো. আব্দুল হাকিম ম-ল। তবে তার মতে, নতুন বিধিমালা কার্যকর করার আগে বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
ড. আব্দুল হাকিম ম-ল বলেন, নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ঘুষের প্রবণতা বাড়তে পারে। আইন যত ভালোই হোক, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আগে থেকেই লাইসেন্সের বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি নেই। ফলে নতুন করে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা চালু করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
