মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্প পাস করানোর আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপস’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষায় যে বাজেট দিয়েছেন, তার সদ্ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত করার দায়িত্ব আমাদের। তিনি শিক্ষার্থীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের জন্য দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে (ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংক) কাজ করার আহ্বান জানান।
এই প্রসঙ্গে তিনি চীনের গবেষকদের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার মাধ্যমে গবেষকরা কাজ করছেন। প্রথাগত সনাতন শিক্ষার সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে মূল্যায়িত হয়ে লাভ নেই, বিশ্ব আজ এআইয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। এআইয়ের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি যোগ করেন, এআই অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়, কিন্তু এআই ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানতে হবে।
শিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের হিসাব তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার সাড়ে ১৩ লাখ টাকা দিচ্ছে এবং এর পাশাপাশি অভিভাবকরাও অর্থ ব্যয় করছেন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, ‘শিক্ষায় বিলাসিতা যেন না হয়।’ শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীরা গবেষণার
মাধ্যমে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, তা দেশের স্বার্থে এবং দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে গিয়ে তাঁদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাচ্ছেন।
সরকার চায়, দেশের শিক্ষার্থীরা দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে গবেষণার ফলাফল বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবেন। এ জন্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও গবেষণার ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। তাই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণার ফলাফল উৎপাদন ও শিল্পখাতে কাজে লাগানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া দেশের ৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে তৃতীয় ভাষা ইনস্টিটিউট চালু করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু এমপি বলেন, বর্তমান সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মানবসম্পদ উন্নয়নে। শুধু বিল্ডিং তৈরি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলে হবে না। অবকাঠামোর উন্নয়ন তখনই স্বার্থক হবে যখন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবে।
তিনি মাভাবিপ্রবিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ১০০০ আসন বিশিষ্ট একটি ছাত্র হল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে ১০০০ আসন বিশিষ্ট একটি ছাত্রী হল ও একটি স্পোর্টস জোন করার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু শিক্ষার্থী পড়ানো, ডিগ্রি প্রদান কিংবা গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এসব গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে গবেষণার ফলাফল বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন- মাভাবিপ্রবির রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য ও টাঙ্গাইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুস সালাম পিন্টু এবং টাঙ্গাইল-৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। এছাড়া ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য(ভিসি) অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন, উপ-উপাচার্য(প্রো-ভিসি) অধ্যাপক মো. আনিছুর রহমান।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে ২৪ টি এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে ১৪টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং ২০২৬ সালের ৩০ জন শিক্ষক ও ১৯ জন শিক্ষার্থীকে রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া ৫ জনকে ‘ইউনিভার্সিটি কমিউনিটি চিলড্রেনস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ প্রদান করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমন্ত্রিত অতিথি এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এর আগে এদিন সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে ‘ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
