কালবেলা · রাজনীতি
৬৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা
10/27/2026

৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন। বিষয়টি কালবেলাকে নিশ্চিত করেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোকাররম হোসেন।
এ মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী আরামিট সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ্ আলম, আরামিটের একাধিক কর্মকর্তা এবং ইসলামী ব্যাংকের জুবলী রোড শাখার ১০ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসিক ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার বাস্তবে কোনো কার্যালয়, গুদাম কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের বহদ্দারহাট শাখায় আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের নামে একটি আল-ওয়াদীয়াহ চলতি হিসাব খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে হিসাবটি জুবলী রোড শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
একই বছরের ১৫ অক্টোবর আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান ওই শাখায় ৫০০ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন ঋণের আবেদন করেন। ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির ক্রেডিট কমিটির ৫১তম সভায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি তা অনুমোদন করে।
এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রাহকের আবেদনের পর ৫৪টি বাই-মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে মোট ২০৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ক্লাসিক ট্রেডিংকে সরবরাহকারী দেখিয়ে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই মামলা করা হয়েছে। অর্থাৎ, দুদকের এজাহারে বর্ণিত ৫৪টি ডিলের পুরো অর্থের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ২৭টি ডিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছে।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট গ্রুপের হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের মালিক ও সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়। অথচ তিনি আরামিট গ্রুপেরই একজন কর্মচারী ছিলেন বলে দুদকের অভিযোগ।
দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর আলমের নামে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ইস্যু করা ৩০৩৯৬ নম্বর ট্রেড লাইসেন্স দাখিল করা হয়েছিল। ওই হিসাবে তার স্ত্রী শাহনাজ আক্তারকে নমিনি দেখানো হয়।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির (ইউসিবি) স্টেশন রোড শাখায় খোলা ওই হিসাবের পরিচয়দানকারী ছিলেন এ আর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন। হিসাব খোলার নথিতে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের ঠিকানা হিসেবে নতুন চাকতাইয়ের ড্রামপট্টিতে সালেহ আহমেদ সওদাগর ভবনের নিচতলার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে ওই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্যালয় কিংবা গুদাম পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রমাণও পাওয়া যায়নি। দুদকের অভিযোগ, বাস্তবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকা সত্ত্বেও ক্লাসিক ট্রেডিংকে সরবরাহকারী এবং আরামিট সিমেন্টকে মালামাল গ্রহণকারী হিসেবে দেখানো হয়। এরপর ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন ও স্ল্যাগসহ সিমেন্ট উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহের কথা উল্লেখ করে ভুয়া ও জাল ইনভয়েস তৈরি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ২৭টি বাই-মুরাবাহা ডিলের অর্থ ছাড়ের জন্য আবেদন করা হয়। আরামিট সিমেন্টের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ্ আলম স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল কেনার কথা উল্লেখ করে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের অনুকূলে অর্থ পরিশোধের আবেদন করেন।
প্রতিটি আবেদনের সঙ্গে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের প্যাডে তৈরি মালামাল সরবরাহের ইনভয়েস দাখিল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে দুদক। এসব নথিতে প্রকৃতপক্ষে মালামাল সরবরাহের তথ্য ছিল না বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের কর্মকর্তারা ইনভয়েস যথাযথভাবে যাচাই না করেই অফিস নোট ও প্রি অডিট মেমো প্রস্তুত এবং তাতে স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নথির ভিত্তিতে ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের নামে পে অর্ডার ইস্যু করা হয়।
এদিকে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ১০ শতাংশ নগদ জামানত থাকার শর্তও ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় ঋণের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি ডিলের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের জুবলী রোড শাখা থেকে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। ওই অর্থ ইউসিবির স্টেশন রোড শাখায় ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের হিসাবে জমা হয়। পরে একই দিন দুটি চেকের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার ও ১ কোটি ২৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ইউসিবির বহদ্দারহাট শাখার একটি পার্কিং হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থ জমা হয় আরামিটের এক কর্মচারীর নামে খোলা ইয়াসিন অ্যান্ড ব্রাদার্সের হিসাবে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ২৭টি ডিলের মধ্যে ২৩টি ডিলের মোট ৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকা ইউসিবির স্টেশন রোড শাখায় ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের হিসাবে জমা হয়। পরে ওই হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর করে আইএফআইসি ব্যাংকের শাহ আমানত মার্কেট শাখায় আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের হিসাবে জমা করা হয়।
অন্য চারটি ডিলের মোট ৭ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ইউসিবির স্টেশন রোড শাখায় ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের হিসাবে জমা হওয়ার পর ইনওয়ার্ড ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংকের জুবলী রোড শাখায় আরামিট সিমেন্টের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। দুদকের অভিযোগ, এভাবে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য আড়াল করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মানিলন্ডারিং ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে দুদক।
মামলায় আরও আসামি করা হয় আরামিট সিমেন্টের এজিএম একেএম মারুফ এবং হিসাব বিভাগের এজিএম ও ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের কথিত স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ইসলামী ব্যাংকের জুবলী রোড শাখার কর্মকর্তা। তারা হলেন প্রিন্সিপাল অফিসার মহিউদ্দীন, বিনিয়োগ বিভাগের প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ আখতার হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল হক, বিনিয়োগ ইনচার্জ ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ আবদুল কাদের, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আবদুল করিম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও বিনিয়োগ ইনচার্জ মো. শহিদুল্লাহ, এফএভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, এসভিপি ও শাখা ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ, এসভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মহসীন আলী এবং সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রিদওয়ানুল হক।
দুদকের অভিযোগ, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঋণের নথি যাচাই, অফিস নোট প্রস্তুত, বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং পে-অর্ডার ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে কোন কর্মকর্তা কোন পর্যায়ে কী ভূমিকা পালন করেছেন, তা তদন্তে নির্দিষ্টভাবে যাচাই করা হবে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোকাররম হোসেন কালবেলাকে বলেন, মামলাটি দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ। এজাহারে ঋণের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ব্যবহার, ভুয়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দেখানো এবং অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও প্রত্যেক আসামির সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗