Authored By:
Published on
:
2 min read
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
বাস্তবে ফেলুদার অস্তিত্ব থাকলে এমন পরিস্থিতিতে তিনি বলে উঠতেন, 'ভালো লাগছে না রে তোপসে, ভালো লাগছে না।' ফেলুদার অনুপস্থিতিতে সেই কথাই বলছেন আবহবিদরা। বিশেষ করে সম্প্রতি উষ্ণতার নিরিখে প্রশান্ত মহাসাগরের জলের উপরিতল রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনর পরে। উষ্ণতায় গড়ল নজির। ২২ অক্টোবর নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যভাগে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছুঁয়ে ফেলেছিল — এমনটাই জানাচ্ছেন আবহবিদরা। ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজ়েশন (ডব্লিউএমও) বা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার রেকর্ডে অতীতে কখনও এমন ঘটনার নজির নেই বলে জানানো হয়েছে। ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা 'গডজ়িলা এল নিনিও' ঘিরে তাই বাড়ছে উদ্বেগ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর প্রভাব আগামী বছরেও প্রথম কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে চলেছে। ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় তার ছাপ পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ইউএসএ–র ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) তথ্য অনুযায়ী, এল নিনিওর গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যভাগের তাপমাত্রার উপরে নজর রাখেন। সেখানকার তাপমাত্রাতেই এই রেকর্ড তাপমাত্রা ধরা পড়েছে। ডব্লিউএমও-র পূর্বাভাস, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা আরও উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ডিসেম্বর নাগাদ তুঙ্গে উঠতে পারে এল নিনিও। তার প্রভাব ২০২৭–এর গোড়াতেও বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনিও কী? প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল যখন অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন এই বিশেষ প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া তৈরি হয়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ এবং বৃষ্টিবাহী মেঘের চলাচলের পথে পরিবর্তন ঘটে। এই ঘটনার প্রভাব শুধুমাত্র প্রশান্ত মহাসাগর–সংলগ্ন এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বহু দূরের দেশেও বদলে যেতে পারে বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ধরন।
বিশেষজ্ঞদের নজর রয়েছে এই উষ্ণতা কত দ্রুত বাড়ছে এবং বায়ুমণ্ডলের উপরিস্তরের বাতাস এর ফলে কতটা প্রভাবিত হচ্ছে তার উপরেও। সমুদ্রের তাপমাত্রা একা চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না। বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন, মেঘের বিন্যাস এবং অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতি মিলিয়েই এল নিনিওর প্রভাব স্পষ্ট হবে।
এ বারের পরিস্থিতিকে আবহবিদরা 'বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক' বলে উল্লেখ করেছেন। ডব্লিউএমও-র হিসেব বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় জুনে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। অগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫ ডিগ্রিতে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর-ডিসেম্বরে ওই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.৭ ডিগ্রি পর্যন্ত উপরে উঠতে পারে। তেমনটা হলে ২০১৫-'১৬–র ২.৬ ডিগ্রির নজির ছাপিয়ে যাবে এ বারের উষ্ণতা। এই সংখ্যাগুলি সমুদ্রের প্রকৃত তাপমাত্রা নয়, দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় কতটা বেশি উষ্ণ, তার হিসেব।
ভারতের জন্যও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৬–এ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মরশুমে দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, সেটি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১২.৬ শতাংশ কম। ডব্লিউএমও-র অক্টোবরের পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আগামী কয়েক মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার ইঙ্গিত মিলেছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এশিয়ার মধ্য ও দক্ষিণ অংশেও বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এল নিনিও একাই ভারতের আবহাওয়া নির্ধারণ করে না। অন্য জলবায়ুগত প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পরিস্থিতিও বৃষ্টি ও তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। তবু প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা তাপপ্রবাহ এবং বৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসে সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির গতিপ্রকৃতি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছে।