চারদিনের সরকারি সফরে জাপানের রাজধানী টোকিওতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রাক্কলনকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই নেতা। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১৪ দফার এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানে তাঁর চার দিনের সরকারি সফরের (২৬-২৯ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনে এই শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রশংসা ও অভিনন্দন
বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে বাংলাদেশে বিরাজমান প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি জাপান সরকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রত্যক্ষ করা গত ফেব্রুয়ারি (২০২৬) মাসের বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে উন্নয়ন যাত্রায় জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করেন। বৈঠকে দুই নেতা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ এবং ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ উদ্যোগের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি বিবেচনায় দুই প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ (BIG-B)-কে উন্নীত করে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র (হাব) হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইনগুলোর দ্রুত নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে উভয় দেশ একমত হয়েছে।
জ্বালানি খাতে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ ও জলবায়ু সহযোগিতা
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের অধীনে প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ‘জরুরি সহায়তা ঋণ’ প্রদানের জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ইপিএ স্বাক্ষর ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও টেকসই উত্তরণে সহায়তার লক্ষ্যে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনার আশ্বাস দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করতে কর, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তিনটি পৃথক সমঝোতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ডিজিটাল রূপান্তর (ডিএক্স), দক্ষ আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ডিজিটাল সংযোগে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ৬টি টহল নৌযান প্রদান
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানানো হয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শীর্ষ ভূমিকার প্রশংসা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ওডিএ সহায়তার আওতায় ১টি বড় টহল জাহাজ (প্যাট্রোল ভেসেল) এবং ওএসএ কর্মসূচির আওতায় ৫টি পেট্রোল বোট প্রদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান দুই নেতা।
স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (২য় পর্যায়)’-এ ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূমিকার প্রশংসা করা হয় এবং মেক্সট (এমইএক্সটি) বৃত্তিসহ বাংলাদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষার প্রসারে একমত হন দুই নেতা।
রোহিঙ্গা সংকট, মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন
যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান বলে উভয় নেতা একমত হন।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী
গাজা পুনর্গঠনে ‘কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান’ এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালী দ্রুত ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উদ্বেগ প্রকাশ এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার করা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি (পিজিএ) হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সফরকালে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়েকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
জাপান-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতি
উভয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে চলে আসা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’- এর আওতায় অবকাঠামো, জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গত পাঁচ দশক ধরে উন্নয়ন সহায়তাসহ জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী রহমান আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি একটি শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জাপানের ধারাবাহিক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে জাপানের গঠনমূলক ভূমিকার কদর করেন। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের উচ্চ প্রশংসা করেন এবং জাপান সরকার কর্তৃক প্রেরিত নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রত্যক্ষ করা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রী রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান।
