খুলনায় আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। প্রতিপক্ষকে হত্যা, গুলি করে জখম, প্রকাশ্যে অপহরণ, ক্লিনিক ভাঙচুর, গুলি করে ভয় দেখানো এবং হুমকির ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি এলাকায় তিন জনকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় অপরাধীদের একজনকেও গ্রেপ্তার হয়নি। গত ৫ দিনে খুলনা মহানগরীতে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে দুই জনকে। এ ঘটনার ৫ দিনেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি, উদ্ধার হয়নি কোনো অস্ত্র।
প্রতিটি অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে নগরীতে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নাম আসছে। অধিকাংশ ঘটনার মূল হোতারা ধরা পড়ছে না। যার কারণে অপরাধও কমছে না। এসব নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নগরবাসী।
খুলনা মহানগর ও জেলা পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে বা অন্য উপায়ে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে। অপরাধের পর গ্রেপ্তার না হওয়া এবং সহজে জামিন লাভ তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। যার ফল দেখা যাচ্ছে প্রকাশ্যে গুলি ও অস্ত্রের মহড়ায়।
এদিকে খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় পৃথক তিনটি এলাকায় যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধরা হলেন- বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি অহিদুল ইসলাম বাদল ও আমিরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সোহেল শেখ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সালমান হাওলাদার। এর মধ্যে সালমানের ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। ওই ব্যাগে প্রতিদিন কর্মস্থলের টাকা নিয়ে ব্যাংকে জমা দিতে যেতেন তিনি। এসব ঘটনায় গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে গত পাঁচ দিনে খুলনায় দুজনকে গুলি করে হত্যা ও ছয়জনকে গুলি এবং একটি ক্লিনিক ভাংচুরের ঘটনা ঘটলো। এই ধারাবাহিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আতঙ্কে রয়েছে খুলনার মানুষ।
অপরাধীরা ধরা পড়ছে না : গত ২২ অক্টোবর ভোরে নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের এসআই শাহ আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে শহিদুল ইসলাম সেজান, সাকিবুর রহমান জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। গত ৫ দিনেও এই মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় খুশি আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূকে। এ ঘটনায় নিহতের বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিক, মিরাজ খানসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায়ও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত শনিবার রাতে নগরীর টুটপাড়া গাছতলা মন্দিরের সামনে রূপসা কলেজের প্রভাষক আকাশ কুণ্ডুকে (৪৫) গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তার ঘটনায়ও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় তিনজনকে গুলির ঘটনায়ও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে হত্যাকাণ্ড দুটি সংঘটিত হয়। আর আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়েছে চাঁদা না দেওয়ায়। তিনটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ক্লিনিকগুলোতে চাঁদার দাবিতে মহড়া : গত শনিবার রাতে খুলনা নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা ক্লিনিকের বাইরে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হন। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এক কর্মীর মোবাইল ফোন। ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক মহিদুল ইসলাম রাজু বলেন, কেন হামলা হয়েছে জানি না। কেউ চাঁদা চেয়েছিল বলেও শুনিনি।
এর আগের দিন প্রিন্স হাসপাতালে প্রবেশ করে চাঁদার দাবিতে হুমকি দেয় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। ২৫ অক্টোবর দুপুরে নগরীর মজিদ সরণিতে অবস্থিত সন্ধানী ক্লিনিকের আরেক শাখায় সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে বেশ কয়েকজন যুবক।
হাসপাতালের চিকিৎসক পার্থ সাহা বলেন, দুপুরে ৮-১০ যুবক ক্লিনিকে প্রবেশ করে ম্যানেজারকে খুঁজতে থাকে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। ম্যানেজারকে না পেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে ‘ভালো হয়ে যা’।
২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় নগরীর শেরে বাংলা সড়কে অবস্থিত সুরক্ষা ক্লিনিকে চাঁদা দাবি করে ফোন করে পারভেজ নামে এক যুবক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ট এক সূত্র জানায়, আতংকে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানাননি।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। গত ১০ মাসে ৬০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু জামিন পেয়ে তারা আবার বইরে চলে আসছে। তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগীরা মামলা ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন না। চাঁদাবাজি বা গুলির ঘটনায় কেউ মামলা করতে চান না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্রুত জামিন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই দুই কারণে খুলনার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম
