সার নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষকরা। সম্প্রতি রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট এলাকার মেসার্স রহমান ট্রেডার্স ডিলার পয়েন্টে। ছবি: খবরের কাগজ
শীতকালীন ফসলের আবাদ ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকরা। জমি প্রস্তুত, বীজ বপন ও চারা রোপণের পাশাপাশি এখন ফসলে সার প্রয়োগের সময়। কিন্তু চাহিদামতো সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মিলছে মাত্র এক-দুই বস্তা সার। অথচ অনেক কৃষকের প্রয়োজন এর কয়েক গুণ বেশি। আবার কোথাও এই এক বস্তা সার পেতে রাতভর দোকানের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ।
কৃষকদের অভিযোগ, দেশে সারের সংকট নেই বলে বারবার জানানো হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি থাকায় প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না তারা। অন্যদিকে খুচরা দোকান থেকেও অল্প পরিমাণে সার কেনার সুযোগ সীমিত। আগে যেসব কৃষক বাকিতে সার ও কীটনাশক কিনে ফসল বিক্রির পর টাকা পরিশোধ করতেন, তাদের এখন নগদ টাকায় সার কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আর এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা।
রাজশাহীর পবা উপজেলার মদনহাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম। গত রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি সার আনতে যান মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট এলাকার মেসার্স রহমান ট্রেডার্সের ডিলার পয়েন্টে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর ১২টার দিকে তিনি পেয়েছেন এক বস্তা ডিএপি ও এক বস্তা এমওপি সার। অথচ তার প্রয়োজন ছিল দুই ধরনের সারই অন্তত পাঁচ বস্তা করে।
আরও পড়ুন
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ, ফুলকপি ও রসুনের আবাদ করব। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছি না। এত কম সার দিয়ে কীভাবে চাষাবাদ করব?’
একই এলাকার কৃষক ফজর আলী বলেন, ‘ডিলারের কাছ থেকে প্রত্যেক কৃষককে এক বস্তা করে ডিএপি ও এমওপি সার দেওয়া হচ্ছে। আজ যে সার পেয়েছি, তা দিয়ে মাত্র এক বিঘা জমিতে কাজ হবে। বাকি জমিতে কী দেব?’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক শামীম হোসেন বলেন, ‘আম ও ভুট্টা চাষের জন্য এক বস্তা সার সংগ্রহ করতে ডিলারের দোকানের সামনে সারা রাত কাটাতে হয়েছে। আমার মতো কৃষকদের কাছে সার সংগ্রহ এখন সময়সাপেক্ষ ও দুর্ভোগের কাজে পরিণত হয়েছে।’
গোদাগাড়ী উপজেলার বাহারামপুর গ্রামের কৃষক নাজমুল হোসেন বলেন, আগে খুচরা দোকান থেকে সার ও কীটনাশক বাকিতে কিনে ফসল তোলার পর টাকা পরিশোধ করতাম। এখন নগদ টাকা দিয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে আমাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।’
মোহনপুর উপজেলার ধামিন নওগাঁ গ্রামের কৃষক বিকাশ চন্দ্র বলেন, ‘আগে খুচরা দোকানে গিয়ে প্রয়োজন মতো সার কিনতে পারতাম। কখনো বাকিতেও সার নেওয়া যেত। এখন একটি নির্দিষ্ট ধরনের সার নিতে হলেও পুরো বস্তা কিনতে হচ্ছে; সঙ্গে অন্য ধরনের সারও নিতে হচ্ছে।’
কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে কয়েকজন সার ডিলারের সঙ্গে কথা বলা হয়। নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের জয়বাংলা মোড় এলাকার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলার আবুল হোসেনের দেওয়া তথ্যে বরাদ্দ ও চাহিদার ব্যবধানের এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। তিনি জানান, অক্টোবর মাসে তার বরাদ্দ ছিল ডিএপি ২০০ বস্তা, এমওপি ১৮২ বস্তা, টিএসপি ৯০ বস্তা ও ইউরিয়া ৯০০ বস্তা। অথচ তার এলাকার মাসিক চাহিদা ডিএপি প্রায় ২ হাজার ৫০০ বস্তা, এমওপি ২ হাজার ৪০০ বস্তা এবং টিএসপি ৬০০ বস্তা। অর্থাৎ শুধু ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেই বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা কয়েক গুণ বেশি।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজারের বিএডিসি ডিলার ওসমান আলী বলেন, ‘অক্টোবর মাসে ডিএপি সার পেয়েছি মাত্র ৬০ বস্তা। অথচ আমার এলাকায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। তাদের মধ্যে অন্তত ২০০ জনের সার প্রয়োজন। কিন্তু বরাদ্দ কম থাকায় জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন কৃষককে মাত্র তিন কেজি সারও দিতে হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা যে বরাদ্দ নির্ধারণ করেন, তা কৃষকের আবাদি জমির প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে মিলছে না। ফলে মাঠপর্যায়ে চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।’
এদিকে খুচরা বাজারে সারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। আগে খুচরা ব্যবসায়ীরা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে সার কিনে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী অল্প অল্প করে বিক্রি করতেন। এতে কৃষকরা প্রয়োজনমতো সার সংগ্রহ করতে পারতেন। কিন্তু ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। ফলে খুচরা বাজার থেকেও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে পারছেন না কৃষকেরা।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার খুচরা সার ব্যবসায়ী মো. শরীফ বলেন, ‘সারের বর্তমান সংকট ৭ মাস আগেই শুরু হয়েছে। ডিলারের কাছে সার নিতে গেলে তারা বলছেন, সব কৃষককেই সার দিতে পারছেন না। খুচরা ব্যবসায়ীদের কীভাবে দেবেন?’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমানের কার্যালয়ে সোমবার ও মঙ্গলবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ছুটিতে আছি। কোনো বক্তব্য বা তথ্য জানতে চাইলে অফিস থেকে নিতে হবে।’
পরে উপ-পরিচালক মোছা. সাবিনা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
