Published on
:
3 min read
তিনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তেমন ‘অ্যাক্টিভ’ নন — যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে এ বারের দুর্গাপুজোর কার্যত সবথেকে ভাইরাল মুখ তিনিই। যে ভাইরাল ভিডিয়ো ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে বই। ‘উন্মত্ত’ দুই যুবকের এ হেন কাণ্ডে বাধা দিচ্ছেন এক বৃদ্ধ। বার বার বলে চলেছেন, ‘বইগুলো নষ্ট করো না, ভাই। পড়ে দেখো। এগুলো চিরায়ত সাহিত্য।’ নাগেরবাজারে সিপিএম-এর বুকস্টলের প্রথম সপ্তমীর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিয়ো ক্লিপ নিয়ে এখনও শোরগোল সোশ্যাল মিডিয়ায়। এতদিনে ওই বৃদ্ধের নাম-পরিচয়ও প্রায় সকলেই জেনে গিয়েছেন। ৭৩ বছরের ওই বৃদ্ধ বিপুল দাশগুপ্ত দমদমের অমরপল্লির বাসিন্দা। বর্ষীয়ান সিপিএম কর্মী এলাকায় পরিচিত ‘বুজু’ নামে। কারও কাছে তিনি দাদা, কারও কাছে জেঠু, কারও কাছে আবার কাকা।
সাতের দশক থেকে রাজনীতির ময়দানে রয়েছেন বিপুল। কিন্তু এ বারের পুজোয় যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তিনি হয়েছেন, তা আগে তার কখনও হয়নি, জানিয়েছেন বিপুল। নকশাল আমল, ইমার্জেন্সির সময় থেকে শুরু করে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনেও এমন পরিস্থিতি তিনি দেখেননি বলেই অভিমত বিপুলের। তাহলে এখন এমন ঘটনা কেন ঘটল বলে মনে হয়? এই সময় অনলাইনের তরফে বিপুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তিনি অসুস্থ। কথা খুব একটা বলতে চাইছেন না। যেটুকু সময় পেলেন, কথোপকথন চলল। বললেন, ‘বইয়ের সঙ্গে রাজনীতি থাকতেই পারে, কিন্তু বই না পড়লে তো সেটা জানতে পারব না। এটা বোধ হয় তাঁদের জানানো হয়নি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে।’
বিপুল দাশগুপ্তের নামে যে ফেসবুক প্রোফাইল রয়েছে, সেখানে তাঁর কার্যত কোনও ‘অ্যাক্টিভিটি’ নেই। ভাইরাল হয়ে উঠেছেন, বুঝলেন কী করে? বৃদ্ধ জানালেন, তাঁর ‘ভাইরাল’ হয়ে ওঠার বিষয়টি তিনি সংবাদমাধ্যমেই দেখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বিষয়টি অন্যরাও জানিয়েছেন তাঁকে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু নয়, যে কোনও প্রচার মাধ্যমের শক্তি সম্পর্কেই সম্যক ওয়াকিবহাল ৭৩ বছর বয়সি পার্টির হোলটাইমার। বিপুল দাশগুপ্তের মতে, ‘সংগঠিত ভাবে একইদিনে গোটা রাজ্যে বুকস্টলের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে জানা গিয়েছে। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আক্রমণের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা যেতেই পারে।’
তিন ভাইয়ের সংসার। সিপিএমের হোল টাইমার বিপুলবাবুর সংসার চলে দাদার পেনশন এবং পার্টির ভাতা থেকে। গত ৪৫ বছর ধরে পুজোর সময়ে তাঁর একটাই রুটিন — নাগেরবাজারে ওই বুকস্টলে থাকা। কোনওদিন আত্মপ্রচার না-চাওয়া বিপুলের কাছে প্রথম সপ্তমী সন্ধের পর থেকে যে এত ফোন আসছে, তাতে তিনি ‘বিব্রত’ বোধ করছেন। এখন আলোচনার কেন্দ্রে উনি এসেছেন, কিন্তু সে দিন সারা রাজ্যে পরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল বলে স্পষ্ট জানালেন বিপুল। ‘অনেক জায়গায় আমার থেকেও প্রবীণ ব্যক্তিরা ওই আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন সে দিন,’ বিপুল বললেন।
দাদার পেনশন আর পার্টির ভাতার সাহায্যে হোলটাইমারের কাজ করে চলেছেন। অর্থাৎ সে অর্থে চাকরি করেননি। লোকে কী বলে বা বলেছে… এটা কতটা ভাবিয়েছে? বিপুলের উত্তর, ‘সারাজীবন আদর্শ মেনে রাজনীতি করেছি। পরিবারের সূত্রে বাম রাজনীতির স্রোতে মেশা আমার। সক্রিয় রাজনীতির জন্য কখনও কারও কোনও মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে, এমনটা একেবারেই মনে পড়ে না।’
যে সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে আপনি ভাইরাল, সিপিএম সেখানে খুব জনপ্রিয়। ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন নেই যদিও। কেন হচ্ছে এমনটা? বিপুলের মতে, ভোটবাক্সে প্রতিফলন নিয়ে পার্টি নেতৃত্ব যা বলার, বলবে। তাঁর কথায়, ‘আদর্শ মেনে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই চলবে আমাদের। পার্টির নির্দেশ মতোই সক্রিয় রাজনীতিতে কাজ করে যাব।’ তবে নবীন প্রজন্মের উপর আস্থা রয়েছে ‘বুজু’দার। সাধারণ পরিবারের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে আসতে চায় না বলে বহু জায়গায় আলোচনা হয়, কী বলবেন? সেই দাবি নস্যাৎ করেছেন বিপুল। বর্ষীয়ান সিপিএম কর্মীর মতে, ‘এখন দেশে তরুণ প্রজন্ম যে আন্দোলন করছে, সেটা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই সংগঠিত হয়েছে। ওই প্রজন্ম পড়াশোনা করেছে এবং রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে বলেই আন্দোলন করছেন তাঁরা।’
ওঁর শরীর বিশেষ ভালো নেই। আপাতত কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার দৈনন্দিন রাজনৈতিক কাজে ফিরবেন। ওই তরুণরা আবার যদি আসে, কী বলবেন? যে তরুণরা হামলা করেছিলেন বুকস্টলে, তাঁদের উপর রাগ নেই বিপুল দাশগুপ্তের — ভয়ও নেই। তাঁর স্পষ্ট উত্তর, ‘আমি একই ভাবে বলব। তাতে যদি তাঁরা আমায় প্রাণে মেরে দেন, তাতেও আমি কুণ্ঠিত নই।’ বরং ওই তরুণদের বোঝানোর উপরেই জোর দিয়েছেন তিনি। ভুল তো মানুষ করতেই পারে, শিক্ষাই তো চেতনা আনে। ‘স্নেহ, শিক্ষা ও চেতনার মাধ্যমেই ওই তরুণদের পথে আনতে হবে... এই প্রক্রিয়া নিরন্তর চলতে থাকবে’, বললেন বিপুল।
ওই ঘটনায় রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ‘বামেরা খালি বুকস্টলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করার চেষ্টা করে।’ যদিও রাস্তা বই ছুড়ে ফেলার প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষের মত, ‘এ ধরনের কিছু করার দরকার নেই। কেন জোর করে সরাবে?’ তবে তাঁর সংযোজন, ‘ওরা জবরদখল করে বড় বড় স্টল দিত, পাঁচ দিন ধরে বসে ঝালমুড়ি আর ফুচকা খেত। আর কিছু হতো না।’
বইয়ের উপর এই হামলা যে একেবারেই নতুন, সে কথা বলছেন রমলা চক্রবর্তী। প্রয়াত সিপিএম নেতা ও মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর স্ত্রী রমলা চক্রবর্তী বর্ষীয়ান সিপিএম নেত্রী। দমদম ও লাগোয়া এলাকায় বাম সংগঠন গড়ে তোলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি জানাচ্ছেন, নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে তৃণমূল জমানা... বামেদের উপর ব্যাপক অত্যাচার হয়েছে, বহু দলীয় কর্মী খুন হয়েছেন। কিন্তু বইয়ের উপর এমন আক্রমণ কখনও নেমে আসেনি। রমলাদেবীর মতে, এই হামলার ঘটনা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে সাধারণ মানুষের। সেই কারণেই নানা জায়গায় হামলার পরেও ফের মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বুকস্টল, বেড়েছে বিক্রি।
