১৯৯৪ সালের ৩০ এপ্রিল। লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের ফরেস্ট গেট এলাকায় গভীর রাত। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমে এসেছে। গায়ানায় বসবাসরত মা-বাবার সঙ্গে কথা বলবেন বলে একটি টেলিফোন বুথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ৩০ বছর বয়সী জো ক্যাম্পবেল। বুথের মেঝেতে পড়ে থাকা একটি জিনিস তাঁর চোখে পড়ল। প্রথমে মনে হলো, কেউ হয়তো খাবারের প্যাকেট ফেলে গেছে। কিন্তু কাছে যেতেই চমকে উঠলেন। ওটি কোনো খাবারের প্যাকেট নয়, কাপড়ে জড়ানো একটি নবজাতক। বয়স মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তখনও তার নাভির সঙ্গে নাড়ির অবশিষ্ট অংশ লেগে আছে। পৃথিবীতে আসার পর যে শিশুর মায়ের কোলে থাকার কথা, সে পড়ে আছে লন্ডনের একটি টেলিফোন বুথের মেঝেতে।
ক্যাম্পবেল মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলেন, শিশুটিকে বাঁচাতে হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলেন। পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স এসে শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। চিকিৎসকেরা জানালেন, নবজাতকের বয়স আনুমানিক দুই ঘণ্টা। শিশুটি কীভাবে এমন জায়গায় এল, কে তাকে রেখে গেল, এসব প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হলো এক গভীর রহস্য।
সেদিন জো ক্যাম্পবেলের একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত একটি শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু যে একদিন বড় হয়ে তাঁকেই খুঁজে বেড়াবে, আর ২২ বছর পর তাঁদের পুনর্মিলন যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হবে, তা ভাবার কোনো কারণ ছিল না।
শিশুটির জন্ম হয়েছিল পূর্ব লন্ডনের একটি বাড়ির বাথরুমে। তার মা ছিলেন পারিবারিক সহিংসতার শিকার। স্বামীর নির্যাতন ও পারিবারিক সংকটের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। নবজাতককে কাপড়ে মুড়িয়ে কাছের টেলিফোন বুথে রেখে আসেন। এরপর ব্রিটেনের মানসিক সংকটে সহায়তাকারী সংস্থা Samaritans-এ ফোন করে শিশুটিকে উদ্ধার করার অনুরোধ জানান। তাঁর আশা ছিল, কেউ এসে শিশুটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাবে। ভাগ্যক্রমে সেই রাতেই টেলিফোন বুথটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জো ক্যাম্পবেল।
শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার পরিচয় অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজ পেতে সময় লেগে যায় প্রায় দুই বছর। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নারী তাঁর অষ্টম সন্তানের জন্ম দিতে হাসপাতালে ভর্তি হলে পুলিশ তাঁর পরিচয় জানতে পারে। তত দিনে পরিত্যক্ত শিশুটি দত্তক পরিবারের আশ্রয়ে চলে গেছে।
উদ্ধারের পর শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল এপ্রিল। জন্মমাসের সঙ্গে মিলিয়ে এই নাম। পরে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একটি পরিবার তাকে দত্তক নেয় এবং নতুন নাম দেয় কিরান শেখ। নতুন পরিবারে শুরু হয় তার বেড়ে ওঠা।
এদিকে জো ক্যাম্পবেল শিশুটিকে ভুলতে পারছিলেন না। উদ্ধার করার মুহূর্ত থেকেই মেয়েটির প্রতি এক অদ্ভুত মমতা জন্মেছিল তাঁর। এমনকি শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু জো তখন অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই কারণে তাঁকে দত্তক নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
দত্তক নিতে না পারলেও মেয়েটির খোঁজ রাখার চেষ্টা ছাড়েননি তিনি। জন্মদিনে কার্ড পাঠাতেন, উপহার কিনতেন, কখনো অর্থও পাঠাতেন। সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে শিশুটির কাছে সেসব পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এভাবে প্রায় সাত বছর যোগাযোগের উদ্যোগ অব্যাহত রাখেন। শেষ পর্যন্ত সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানিয়ে দেয়, শিশুটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা আর করা যাবে না।
জো সেই নির্দেশ মেনে নেন। কিন্তু শিশুটির স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেননি। তাঁর কাছে মেয়েটির একটি পুরোনো ছবিও ছিল। নিজের সন্তানদেরও তিনি প্রায়ই সেই শিশুটির গল্প বলতেন, যাকে এক গভীর রাতে টেলিফোন বুথ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। কোথায় আছে মেয়েটি, কেমন আছে, বড় হয়ে কী করছে, এসব প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই তাঁর মনে উঁকি দিত।
অন্যদিকে কিরান শেখ বড় হচ্ছিলেন নিজের পরিচয় সম্পর্কে নানা প্রশ্ন নিয়ে। আট বছর বয়সের দিকে বুঝতে পারেন, যাঁদের মা-বাবা বলে জানেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর চেহারা ও পারিবারিক মিলের কিছু পার্থক্য রয়েছে। একসময় জানতে পারেন, তিনি দত্তক সন্তান। এই সত্য তাঁর মনে জন্ম দেয় অসংখ্য প্রশ্ন। কে তাঁর জন্মদাত্রী মা? কেন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? কীভাবে তিনি নতুন পরিবারে এলেন?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহও বাড়তে থাকে। নিজের দত্তকসংক্রান্ত নথিপত্র অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন জীবনের প্রথম রাতের অবিশ্বাস্য ঘটনাটি। জানতে পারেন, জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে টেলিফোন বুথে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে এক অপরিচিত মানুষ তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন।
আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। নথিপত্র থেকে জানতে পারেন, সেই মানুষটি বছরের পর বছর তাঁর জন্মদিনে উপহার, কার্ড ও অর্থ পাঠিয়েছিলেন। সমাজসেবা বিভাগের কাছে জমা দেওয়া এসব উপহার তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। এমনকি জন্মদিনের কার্ডগুলোর ভেতরে কী লেখা ছিল, তা-ও জানতে পারেননি। একজন অপরিচিত মানুষ এত বছর ধরে তাঁর কথা মনে রেখেছেন, এই তথ্যই তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
কিরান সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক মানুষটিকে খুঁজে বের করবেন। নিজের অতীতের সব প্রশ্নের উত্তর না পেলেও অন্তত একজনকে ধন্যবাদ জানাতে চান। সেই মানুষটিকে, যিনি জন্মের প্রথম রাতেই তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে কিরানের অনুসন্ধানের খবর প্রকাশিত হয়। তখন তাঁর বয়স ২২ বছর। প্রতিবেদনে তিনি জানান, উদ্ধারকারীর নাম জো ক্যাম্পবেল। তিনি মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে চান। জানতে চান, সেদিন রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেন তিনি একটি অপরিচিত শিশুর প্রতি এত মমতা দেখিয়েছিলেন।
ঘটনাটি প্রকাশের পর ঘটে আরেক বিস্ময়কর ঘটনা। জো ক্যাম্পবেলের এক সহকর্মী সংবাদপত্রে কিরানের ছবি ও তাঁর অনুসন্ধানের খবর দেখতে পান। তিনি ক্যাম্পবেলকে খবরটি দেখিয়ে বলেন, এ তো তোমারই গল্প!
প্রথমে জো বিশ্বাস করতে পারেননি। তারপর মেয়েটির ছবি দেখে বুঝলেন, এই সেই শিশু। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যার কথা ভেবেছেন, যার খোঁজ রাখার চেষ্টা করেছেন, সে-ই এখন তাঁকে খুঁজছে।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তাঁদের দেখা হলো। তখন ক্যাম্পবেলের বয়স ৫২ বছর। ২২ বছর আগে যে শিশুটিকে তিনি টেলিফোন বুথের মেঝে থেকে উদ্ধার করেছিলেন, সে এখন পূর্ণবয়স্ক তরুণী। সেই রাতের স্মৃতি ক্যাম্পবেলের মনে আজও জীবন্ত। আর কিরানের কাছে সেই রাতের ঘটনা তাঁর নিজের জীবনের এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।
পুনর্মিলনের পর ব্রিটিশ টেলিভিশন অনুষ্ঠান Good Morning Britain-এ ক্যাম্পবেল বলেছিলেন, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিনগুলোর একটি। কারণ মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার আশা তিনি কখনো ছাড়েননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জীবদ্দশায় কোনো না কোনোভাবে আবার মেয়েটির সঙ্গে দেখা হবে।
কিরানও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। যে মানুষটি জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিলেন, ২২ বছর পর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সেই মানুষটিকেই কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
পুনর্মিলনের আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য ছিল, দুজনেই দীর্ঘদিন লন্ডনে বসবাস করছিলেন। তাঁদের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। হয়তো একই রাস্তা দিয়ে চলেছেন, একই দোকানে গেছেন, একই শহরের ব্যস্ততায় একে অন্যের পাশ কাটিয়ে গেছেন। অথচ কেউ কাউকে চিনতে পারেননি।
জো কিরানকে নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেন। জানান, তাঁর সন্তানরাও কিরানের ভাইবোনের মতো। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাঁদের মধ্যে পরিবারের বন্ধন তৈরি হতে পারে। কিরানের কাছে এই আশ্বাস ছিল এক নতুন প্রাপ্তি।
কিরানের জন্মদাত্রী মায়ের গল্পটিও ছিল বেদনাময়। ২০১৬ সালে তিনি মায়ের ঠিকানা খুঁজে বের করেন। মা থাকতেন তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে। একদিন মায়ের দরজায় হাজির হলে মা তাঁকে চিনতে পারেন, কিন্তু কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি। কেন জন্মের পরপরই তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও দেননি।
কিরান এখন এপ্রিল পল নামে পরিচিত। জন্মের পর ক্যাম্পবেল তাঁর নাম রেখেছিলেন এপ্রিল। সেই নামটি ফিরিয়ে নিতে ২০২৬ সালে তিনি আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। এখন তাঁর বয়স ৩২ বছর। পশ্চিম লন্ডনে বসবাস করেন এবং একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। ক্যাম্পবেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গত এক দশকে আরও গভীর হয়েছে। তাঁরা প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেখা করেন। ক্যাম্পবেলের সন্তানদের নিজের ভাইবোনের মতো মনে করেন এপ্রিল। বাইশ বছর পর খুঁজে পাওয়া মানুষটি এখন তাঁর পরিবারেরই একজন।
তথ্যসূত্র: ITV News, Inside Edition, Good Morning Britain
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::একটি টেলিফোন বুথ এক নবজাতক আর ২২ বছরের অপেক্ষা first appeared on DesheBideshe.