ওজন কমাতে অনেকেই খাবার কম খান, নিয়মিত ব্যায়াম করেন। তারপরও কারও কারও ওজন কমতে চায় না। এর পেছনে থাকতে পারে দৈনন্দিন জীবনের কিছু ভুল অভ্যাস।
শুধু কম খাওয়া বা বেশি ব্যায়াম করলেই ওজন কমে না। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও ধৈর্য— সবই গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন কমানোর চেষ্টা সফল করতে জেনে নিন আটটি সাধারণ ভুল সম্পর্কে।
একই ধরনের ব্যায়াম দীর্ঘদিন করা: প্রতিদিন একই ধরনের ব্যায়াম করলে একসময় তা একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে। শরীরও নির্দিষ্ট ব্যায়ামের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তার মানে এই নয় যে, একই ব্যায়ামে শরীরের শক্তি খরচ একেবারে কমে যায়।
ওজন কমানোর সময় ব্যায়ামের ধরন, সময় ও তীব্রতায় প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
যেমন, দ্রুত হাঁটার পাশাপাশি সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বা শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা যেতে পারে। এতে শরীর সক্রিয় থাকে এবং ব্যায়ামের অভ্যাস ধরে রাখাও সহজ হয়।
শুধু হাঁটা বা দৌড়ানো, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম না করা: ওজন কমাতে অনেকে শুধু হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইকেল চালানোর ওপর নির্ভর করেন। তবে পেশির শক্তি ও ভর বজায় রাখতে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামও প্রয়োজন।
হালকা ওজন তোলা, ‘স্কোয়াট’ বা ওঠবস বা নিজের শরীরের ভার ব্যবহার করে ব্যায়াম করলে পেশির শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ওজন কমানোর সময় পেশি ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সম্ভব হলে সপ্তাহের ব্যায়ামের রুটিনে হাঁটা বা অন্য বায়বীয় ব্যায়ামের পাশাপাশি শক্তিবর্ধক ব্যায়াম রাখুন। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন নির্বাচন করতে হবে।
ব্যায়ামের পর বেশি খেয়ে ফেলা: ব্যায়াম করার পর অনেকেই মনে করেন, এখন একটু বেশি খেলেও সমস্যা হবে না। তবে ব্যায়ামে যে পরিমাণ শক্তি খরচ হয়, তার চেয়ে বেশি ক্যালরি খাবার থেকে গ্রহণ করলে ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যেমন, আধা ঘণ্টা হাঁটার পর অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয় বা ভাজাপোড়া খেলে ব্যায়ামে খরচ হওয়া শক্তির একটি বড় অংশ আবার পূরণ হয়ে যেতে পারে।
তাই ব্যায়ামের পর ক্ষুধা লাগলে পরিমিত খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে ডিম, দুধ, টক দই বা ফলের মতো খাবার বেছে নেওয়া যায়। ব্যায়ামকে বেশি খাওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ব্যায়ামের জন্য অনেক সময় প্রয়োজন বলে মনে করা: অনেকে মনে করেন, অন্তত ৩০ মিনিট একটানা ব্যায়াম করতে না পারলে কোনও লাভ নেই। এ ধারণা ঠিক নয়। ব্যস্ততার কারণে একটানা ব্যায়াম সম্ভব না হলে, দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে শারীরিক কার্যকলাপ করা যায়।
যেমন, সকালে ১০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দুপুরে সিঁড়ি ব্যবহার করা এবং বিকেলে আরও ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা। এভাবে দিনের মোট শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো সম্ভব।
তবে শুধু অল্প সময় হাঁটলেই সব ধরনের ব্যায়ামের চাহিদা পূরণ হবে না। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় ও পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।
ক্লান্তির কারণে ব্যায়াম একেবারে বাদ দেওয়া: কাজের চাপ বা ক্লান্তির কারণে অনেকেই ব্যায়াম করতে চান না। এমন দিনে কঠিন ব্যায়াম করার পরিবর্তে ১০ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
হালকা শরীরচর্চা অনেকের ক্ষেত্রে মন ভালো রাখতে এবং সতেজ বোধ করতে সাহায্য করে। তবে অসুস্থতা, তীব্র দুর্বলতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকলে বিশ্রাম নেওয়া জরুরি।
প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করার চাপ না নিয়ে, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা উপকারী। নিয়মিত অল্প অল্প করে শরীরচর্চা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ওজন কমাতে অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া: ওজন কমানোর সময় প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, ডাল ও ছোলা প্রোটিনের ভালো উৎস। পেশির ভর বজায় রাখতে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভব করতে সাহায্য করে প্রোটিন।
তবে বেশি প্রোটিন খেলেই দ্রুত ওজন কমবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত শক্তি শরীরে জমা হওয়ার সুযোগ থাকে, প্রোটিনের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।
তাই শুধু প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাড়িয়ে অন্য খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। বরং পরিমিত পরিমাণে প্রোটিনের পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, পরিমিত ভাত বা রুটি এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার রাখতে হবে।
সকালের নাশতার বদলে শুধু ফলের রস পান করা: ফলের রসে কিছু ভিটামিন ও খনিজ থাকলেও পুরো ফলের তুলনায় এতে সাধারণত আঁশ কম থাকে। তাই শুধু ফলের রস পান করলে পুরো ফল খাওয়ার মতো তৃপ্তি নাও পাওয়া যেতে পারে।
সকালের নাশতায় শুধু ফলের রস পান করার পরিবর্তে ডিম, রুটি, সবজি বা ওটসের সঙ্গে একটি আস্ত ফল খাওয়া উপকারী। চাইলে পরিমিত পরিমাণে দুধও রাখা যায়।
আস্ত ফলের আঁশ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ফলের রস দ্রুত পান করা যায় বলে একসঙ্গে অনেক ফলের শর্করা ও ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ফলের রস খেলেই রক্তে শর্করা অবশ্যই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে, এমন নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে রসের পরিমাণ, উপাদান এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া: ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বাড়তে পারে। যে কারণে অনেকে বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খেয়ে ফেলেন।
ঘুমের ঘাটতি থাকলে ক্লান্তির কারণে শরীরচর্চা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এভাবে ঘুমের অনিয়ম ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করে।
তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। বয়স ও ব্যক্তিগত অবস্থাভেদে প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে।
ওজন কমাতে আরও যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
ওজন কমানোর জন্য না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাবার খাওয়া, পরিমিত পরিমাণে খাবার গ্রহণ, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধৈর্য ধরে অভ্যাস পরিবর্তন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন কমানোর গতি সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ, ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়, এমন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
