নিজস্ব প্রতিবেদক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ারের পথেও যেতে পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ কঠোর হলে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে দুর্বলতার অভিযোগ তোলা হয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইজিপি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
‘ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার তাগিদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, সুদের নেতিবাচক প্রভাব এবং ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
আইজিপি বলেন, ইসলামে সুদ ও ঘুষ নিষিদ্ধ। প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদমুক্ত লেনদেনের পাশাপাশি অংশীদারত্ব, নৈতিকতা এবং ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অতীতে ব্যাংক দখল, বিভিন্ন অনিয়ম এবং উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নজরদারি কার্যকর না হলে শুধু আইন প্রণয়ন করে সুফল পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষের নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান ব্যবস্থাপনার অধীনে গ্রাহকদের আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে যেসব অনিয়ম ও বিপর্যয় ঘটেছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) ওপর নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, পুলিশকে অকার্যকর করার কোনো চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
পুলিশ সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাহিনীর অভ্যন্তরেও জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে। তবে পুলিশের ওপর বারবার আক্রমণ কিংবা বাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়ার চেষ্টা চললে সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের কার্যকর সুযোগ দিতে হবে। গুজব ও মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে সংবিধান ও আইন মেনে দায়িত্ব পালনে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন আইজিপি। তাঁর দাবি, সে সময় ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা মাদক ব্যবসা থেকে নিয়মিত অর্থ পেতেন এবং পুলিশের কিছু সদস্যও এতে জড়িত ছিলেন।
পুলিশের অভ্যন্তরে অনিয়ম বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নিজেদের বাহিনীর অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি পুলিশের সমালোচনা করে নাগরিক সমাজের ১০১ জন সদস্যের দেওয়া একটি বিবৃতির প্রসঙ্গ টেনে আইজিপি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার অর্থ যা ইচ্ছা তা করার অধিকার নয়; প্রত্যেককে আইনের আওতায় থাকতে হবে।
পুলিশ সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই বাহিনীতে শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে সেবা দেওয়া কনস্টেবলদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু সব সমস্যার দায় পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বাহিনীকে অকার্যকর করা যাবে না। পুলিশের কাজের ক্ষেত্রেও সংবিধান অনুযায়ী জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব পালন নিয়ে পুলিশের মধ্যে যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে পুলিশ দিন-রাত কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের জন্য আধুনিক বিকল্প ব্যাংকিং সুবিধা চালুর লক্ষ্যে ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর যাত্রা শুরু হয়েছে।
