চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে একটি মিনি ট্রাক থামিয়ে ৩০ হাজার ইয়াবা লুটের অভিযোগ উঠেছে সাতকানিয়া থানার কয়েক পুলিশ সদস্য ও তাদের কথিত সোর্সের বিরুদ্ধে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চর হাট-সংলগ্ন মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাটের একটি সড়কের নির্জন স্থানে ট্রাকটি থামানোর পর কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের মাধ্যমে থানার কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ ও গাজী মো. মহসিন চালকের সিটে বসে ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন।
এ সংক্রান্ত দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে প্রতিবেদকের হাতে।
আরও পড়ুন
সেখানে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদকে ট্রাকের সামনে এবং মহসিনকে চালকের পাশে অবস্থান করতে দেখা যায়। তবে তারা উভয়ই মাস্ক পরিহিত ছিলেন। পরে থানার একাধিক উপ-পরিদর্শক, সহকারী উপ-পরিদর্শক ও কনস্টেবল তাদেরকে সনাক্ত করেন।
একই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা দুজনেই কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের মাধ্যমে ট্রাকটি উপজেলার কেরানীহাট রেলক্রসিং সংলগ্ন একটি এলপিজি স্টেশনে আনার পর তল্লাশি করে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে ফেলেন।
আরও পড়ুন
দুই কনস্টেবল ও তাদের কথিত সোর্স ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পুরো কার্যক্রম তদারকি করেন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম। ওই সময় তিনি সঙ্গে করে থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহাকে সঙ্গে নিয়ে যান।
ঘটনার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে এসআই মাহবুব এবং কনস্টেবল প্রীতম লোহাগাড়া এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। এমনকি ঘটনার সময় কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিনও লামার সীমান্তবর্তী পুটিবিলা এলাকায় অবস্থান করেছিলেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
থানার সংশ্লিষ্ট একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বিষয়টি নজরে আসার পর এ বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ইসলামনগর এলাকায় নীল রঙের একটি মিনি ট্রাক সড়কের পাশে রেখে রেস্টুরেন্টে খাবার খাচ্ছিলেন চালক নাছির। ট্রাকটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ড-১২-৭৫৩৮। এ সময় সেখানে পুলিশের কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের সঙ্গে তার দেখা হয়।
পরে নাছির মাতামুহুরী নদীর সেতু সংলগ্ন একটি পাম্প থেকে জ্বালানি নিয়ে বান্দরবানের লামার উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি অপর এক মাদক বহনকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো ট্রাকের চালকের আসনের নিচে তৈরি করা বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে রাখেন। এরপর তিনি খালি ট্রাক নিয়ে লোহাগাড়ার পুটিবিলা সড়ক হয়ে ফকিরহাট এলাকায় সবজি নিতে রওনা দেন।
চালক নাছির তার গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু দূর আগে থেকে একটি মোটরসাইকেল ও একটি মাইক্রোবাস নিয়ে রবিন, মোমেন এবং কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিন ট্রাকটির পিছু নেন। একপর্যায়ে নির্জন স্থানে পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ট্রাকটি থামান। এরপর কনস্টেবল মহসিন ট্রাকের জানালা খুলে চালকের পাশের আসনে বসেন এবং নাছিরকে হাতকড়া পরিয়ে দেন। পরে কনস্টেবল ফয়েজও চালকের পাশের আসনে বসেন।
এরপর তারা ট্রাকটি বিভিন্ন আমিরাবাদ ও ঠাকুরদীঘি ঘুরিয়ে কেরানীহাট রেলক্রসিং সংলগ্ন একটি এলপিজি স্টেশনে নেওয়া হয়। সেখানে চালককে ট্রাক থেকে নামিয়ে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তারা ট্রাকচালকের আসনের নিচে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিজেদের হেফাজতে নেন। পরে এসআই মাহবুব একটি মোটরসাইকেল নিয়ে পৌঁছালে ঘটনাস্থলে থাকা অন্যরা ট্রাকের চাবি ও চালককে তার জিম্মায় দিয়ে দ্রুত সরে যান। পরে এসআই মাহবুব ট্রাকচালক নাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং চড়-থাপ্পড় মারেন বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে এসআই মাহবুব পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রাক আটকে রাখার খবর থানায় জানিয়ে আরও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। তবে এরই মধ্যে ট্রাকটিতে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানতে পেরে তারা দুজনেই সেখান থেকে চলে যান।
পরে এসআই মাহবুব চালক নাছিরের কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে মোবাইলে একটি ভিডিও ধারণ করে চালক ও ট্রাকটি ছেড়ে দেন। এর পরপরই ট্রাকের চালক চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করেন।
পুলিশের কথিত সোর্স মোমিন শুরুতে মাইক্রোবাস ও পরে ট্রাকের চালক ছিল। পরে তিনি বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি পুলিশের মাদক উদ্ধার সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন।
এ প্রসঙ্গে ট্রাকচালক নাছির খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি লামা থেকে লোহাগাড়া আসার পথে মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকায় পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে আমার ট্রাকের গতিরোধ করেন। এরপর এক পুলিশ সদস্য ট্রাকের সামনের সিটে উঠে আমার এক হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল ফয়েজও ট্রাকে ওঠেন। এ সময় তারা ট্রাকে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলেন। পরে তারা আমাকে লোহাগাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্সে নিয়ে তাদের সাইট না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ট্রাফিক আইনে একটি মামলা দেওয়ার কথা বলেন। এরপর ফোনে কথা বলে আমাকে আবার সাতকানিয়ার ঠাকুরদিঘী পেট্রলপাম্প এলাকায় নিয়ে আসেন। সেখানে রবিন ও মোমিনের মোটরসাইকেলের সঙ্গে অপর একটি মোটরসাইকেল নিয়ে আরও তিন যুবক যোগ দেন।’
ট্রাকচালক বলেন, ‘একপর্যায়ে আমাকে কেরানীহাট রেলক্রসিংয়ের পর একটি এলপিজি পাম্পের নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এক পুলিশ সদস্য আসেন। এরপর আমাকে ট্রাক থেকে নামিয়ে ওই অটোরিকশায় তোলা হয়। আমার এক হাতে এবং অটোরিকশার লোহার সাথে হাতকড়া লাগানো হয়। ওই পুলিশ সদস্য আমাকে নিয়ে অটোরিকশাটি কিছুটা সামনে এগিয়ে অবস্থান করেন। এ সময় ফয়েজ, রবিন, মোমিনসহ অন্য পুলিশ সদস্য ও তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা আমার ট্রাকে তল্লাশির নামে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। পরে ট্রাকের সিটের নিচে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিয়ে যান। সেখানে তিনটি বড় পোটলায় ১০ হাজার করে এসব ইয়াবা রাখা ছিল। এ ছাড়াও পরবর্তীতে আমার ট্রাকের সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ফরম্যাট করে দেওয়া হয়।’
নাছির বলেন, ‘এরপর কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সোর্সরা ইয়াবা নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে আর কয়েকজন আমাকে ঘুরিয়ে সি ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের সামনে নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর ওবাইদিয়া মাদরাসা গেট সংলগ্ন সড়ক বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ভবনের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই পুলিশ সদস্য আমার ট্রাকের চাবি এসআই মাহবুবের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তারাও চলে যান। পরে এসআই মাহবুব ও এক কনস্টেবল আমার ট্রাকে ইয়াবা আছে বলে অভিযোগ তুলে আমাকে মারধর করেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তবে এর আগে একদল ব্যক্তি আমার ট্রাক থেকে ইয়াবা নিয়ে গেছেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে বিষয়টি আমি তাদের কাছে স্বীকার করিনি। পরে সেখানে আসা আরও দুই পুলিশ সদস্যকে আমি জানায়, কয়েক ঘণ্টা ধরে আমার ট্রাকটি বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। এ কথা শুনে ওই দুই পুলিশ সদস্য আর তল্লাশি করতে অপারগতা প্রকাশ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে এসআই মাহবুব ট্রাকটি তল্লাশি করেননি, এমন একটি ভিডিও বক্তব্য রেকর্ড করে আমাকে ছেড়ে দেন। এরপর আমি গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে চলে যাই।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাই আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো লাভ হবে না। এ বিষয়ে আমি আপনাকে কিছু জানাতেও রাজি নই। কারণ ঘটনার দিন রাতে আমি থানায় ছিলাম। এ বিষয়ে কিছু জানার থাকলে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।’
অপর কনস্টেবল গাজী মো. মহসিন বলেন, ‘আমি সেখানে ছিলাম না, তাই আমি এসব বিষয়ে কোন ধরনের মন্তব্য করতে রাজি না।’
থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহা বলেন, ‘ঘটনার রাতে এসআই মাহবুব স্যারের দাঁতের চিকিৎসক দেখানোর জন্য আমি তার সঙ্গে লোহাগাড়া গিয়েছিলাম। সেখানে চিকিৎসককে না পেয়ে আমরা ফিরে আসি। পরে ঠাকুরদিঘী হয়ে কেরানীহাটে যাই। ওই সময় স্যারকে ফোনে সোর্সের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি। এর অনেকক্ষণ পর ট্রাকটি আটকানো হয় আমি সাধারণত বাইরে ডিউটি করি না। তবে সেদিন স্যার আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন।’
এদিকে, সোর্স রবিনের ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর অপর সোর্স মোমিনের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা একটি ট্রাক থামিয়েছিলাম। পরে ট্রাক চালক আগেই তল্লাশি করা হয়েছে বলে জানালে আমি সোর্সকে বকাঝকা করার পর ট্রাকটিতে আর তল্লাশি না চালিয়ে চালকের ভিডিও নিয়ে ছেড়ে দিয়েছি।’
কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে আমার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ওই সময় আমি ব্যস্ত থাকায় ফয়েজকে দিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় ফয়েজ আমার সন্তানের অনেক সেবা-যত্ন করেছিলেন। সেই থেকেই ফয়েজের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক তৈরি হয়।’
সোর্স রবিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মাহবুব বলেন, ‘ইতোপূর্বে রবিনের বাবা মাছ ব্যবসায়ী বাবুলকে একবার রাজনৈতিক মামলায় আটক করা হয়েছিল। ওই সময় রবিন থানায় এসেছিল। সেখানেই আমার সঙ্গে রবিনের পরিচয় হয়। পরে রবিনকে মাদক পাচার সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে আমাকে জানাতে বলেছিলেন।’
সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
আরিফুল ইসলাম/অমিয়/
