
এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ : সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বারহাল ইউনিয়নের সমসখানি গ্রামে অবস্থিত চাঁদ খাঁর দিঘি। প্রায় ১২ কেদার জমিজুড়ে বিস্তৃত এই দিঘি স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনশ্রুতির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। দিঘিটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনি। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়া এই জলাশয় যথাযথ অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে হয়ে উঠতে পারে জকিগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। চাঁদ খাঁর দিঘিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা জনশ্রুতি। প্রবীণদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া এসব কাহিনি দিঘিটিকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় শনি ও মঙ্গলবার রাতে দিঘি থেকে করতালের শব্দ শোনা যেত। এ ছাড়া কারও বাড়িতে বিয়ের আয়োজন থাকলে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর নাম লিখে একটি টুকরা দিঘিতে নিক্ষেপ করা হতো। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, এর মাধ্যমে দিঘি থেকে বিয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যেত।
কথিত আছে, এক ব্যক্তি দিঘি থেকে একটি বাটি চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে সামগ্রী পাওয়ার সেই ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়। এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা অবশ্য এখনো প্রামাণ্য তথ্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও জনবিশ্বাসের অংশ হিসেবে কাহিনিগুলো দিঘিটির পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
দিঘিটির প্রকৃত ইতিহাস, নির্মাণকাল এবং এর সঙ্গে কথিত নবাবি আমলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানতে প্রয়োজন অনুসন্ধান ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ। স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষাৎকার, পুরোনো দলিলপত্র, ঐতিহাসিক নথি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চাঁদ খাঁর দিঘিকে একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি স্থানীয় পর্যটনের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এলাকার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও বাড়বে।
এ জন্য প্রথমে দিঘিটির সঠিক আয়তন, ঐতিহাসিক পরিচিতি, বর্তমান অবস্থা এবং পরিবেশগত গুরুত্ব নিরূপণ করা প্রয়োজন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে দিঘির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ, বসার স্থান তৈরি এবং নিরাপদ চলাচলের উপযোগী পথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চাঁদ খাঁর দিঘি শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্থান। এমন স্থানের ইতিহাস যথাযথভাবে অনুসন্ধান ও নথিবদ্ধ করা না হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বহু পুরোনো কাহিনি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তাই দিঘিটির ইতিহাস অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ইতিহাস-গবেষক, পরিবেশবিদ এবং এলাকাবাসীকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জনশ্রুতিগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা এবং পুরোনো নথি অনুসন্ধানের মাধ্যমে দিঘিটির অতীত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য বের করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগে চাঁদ খাঁর দিঘির ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিকল্পিত পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা গেলে তা জকিগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য সংরক্ষণের সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি এলাকার পরিচিতিও বিস্তৃত হবে।
