মানুষ কেন জন্ম নেয়? কেনই বা বাঁচে? আবার কেনই বা মরে যায়। মহাকালের তুলনায় মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি কত ক্ষুদ্র। আবার মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব একেবারেই তুচ্ছাতিতুচ্ছ। তবুও এই জীবন নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন, কত আশা। কত প্রাপ্তি কত অপ্রাপ্তির সমাহার সেখানে। সেই ক্ষুদ্র জীবনেও আবার কত অধ্যায়। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, বার্ধক্য। আবার এই পৃথিবীতেই কত রকমের মানুষ। রঙের বিন্যাস বা আয়ুর বিন্যাসে কত বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্য আছে জীবনযাপন পদ্ধিতেও।
এর মধ্যে আবার তৈরি হয়েছে জীবনযাপনের কত রকমের মানদণ্ড। জীবনকে সংজ্ঞায়িত করার কত রকমের কৌশল। নির্ধারণ করা হয়েছে আরাম–আয়েশের অনুষঙ্গ। গড়ে উঠেছে সভ্যতা। আর এসব করতে গিয়েই তৈরি হয়েছে মানুষে মানুষে কত রকমের ভেদাভেদ। আমি অবশ্য ভেদাভেদ না বলে বৈচিত্র্য বলি তাহলে শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শব্দটা ভেদাভেদ হওয়ায় অধিক যুক্তিসংগত। সমাজে কত রকমের যে ভেদাভেদ বিদ্যমান। বাস্তুসংস্থান বলে এক প্রাণী অন্য প্রাণীর ওপর খাদ্যের জন্য নির্ভরশীল। আর এভাবেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য ধরে রাখে। জীবনচক্র চলমান থাকে।
প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। মানুষের কাছে ফিরে আসা যাক। মানুষই নিজেকে সৃষ্টির সেরা প্রমাণ করতে কত রকমের যে সুযোগ–সুবিধা আবিষ্কার করেছে। আর এসব করতে গিয়েই সে প্রকৃতি থেকে নিজেকে দিনে দিনে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সামাজিক–সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে জীবনকে বিচার করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা জীবনকে সহজ করার নামে একটা করে আবিষ্কারের মাধ্যমে জীবনকে আসলে আরও বেশি জটিলই করেছেন। অন্যদিকে দার্শনিকেরা সেটার ভারসাম্য রাখতে গিয়ে আবার জীবনের নতুন নতুন মানদণ্ড নিয়ে হাজির হয়েছেন।
মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জায়েজ করতে গিয়ে কত কিছুই না করেছে এবং করছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞানের মতো বিষয়ের অবতারণা করেছে। এত কিছু করার পরও তারা এখনো মৃত্যুর কাছে অসহায়। তারা জেনে গেছে জীবন যতই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ হোক মৃত্যু এড়ানোর কোনো উপায় নেই। তখন তারা নিজেদের আয়ুকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। আবিষ্কার করেছে রোগ, সেই সঙ্গে তার চিকিৎসা। এখন কোনটা আসলে রোগ আর কোনটাই বা তার চিকিৎসা, সেটা নিয়ে ভিন্নমতও আছে। ভাষা আবিষ্কার করেছে। সেখান থেকে লেখার উপায়। যেই লেখার উপায় আবিষ্কার করেছে, সেই তারা তাদের অভিজ্ঞতা লিখতে শুরু করেছে। সেটা যতটা না সভ্যতার কল্যাণের জন্য, তার চেয়ে বেশি নিজেকে অমর করে রাখার জন্য। যদিও সে জানে না তার মারা যাওয়ার পর এগুলো আদৌ তার কোনো কাজে আসবে কি না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
এই জীবনের এত এত উদ্যাপন মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সেটা একটা আবর্জনা বৈ আর কিছু নয়। যত দ্রুত পারা যায় সেই আবর্জনা থেকে মানুষ মুক্ত হতে চায়। কেউ মরা মানুষকে মাটির নিচে কবর দেয়, আবার কেউ পুড়িয়ে ফেলে। এরপর যত দ্রুত পারে মৃত মানুষটাকে ভুলেও যায়। তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে মাঝেমধ্যে কথা হয়, কিন্তু সেই পর্যন্তই। কারণ, মৃত মানুষের জন্য আসলে আর কোনো করণীয় থাকে না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ যে নিজেকে অমর করে রাখার দৌড়ে লিপ্ত থাকে, মৃত্যু সেখানে একটা দাঁড়ি টেনে দেয়। জানি না কবে থেকে এমনটা চলছে। বিজ্ঞান একরকম বলছে। দর্শন একরকম বলছে। পাশাপাশি হাজারো রকমের ধর্মের রয়েছে হাজারো রকমের মতবাদ। কিন্তু কোনোটাই মৃত্যুকে আর রুখতে পারে না।
মানুষের গড় আয়ু যদি ৮০ বছর ধরি, তাহলে ৪০ বছর অর্ধেক আয়ু। এই ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেকটা মানুষই কোনো না কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শৈশব কৈশোর, তারুণ্যের উদ্দাম দিনগুলো পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ। এই সময়ে সে নিজেকে পৃথিবীতে টিকে থাকার যোগ্য করে তুলতে চেষ্টা করে আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর সংসার পাতা। সংসার তাকে পাততেই হবে, কারণ প্রকৃতি চায় যে মানুষ বেঁচে থাকুক, বংশ রক্ষা করুক। সেই সংসার করতে গিয়ে সন্তান উৎপাদন। তাদের বড় করে তোলার বিষয়টাকে দায়িত্ব বানিয়ে ফেলা। এসব করতে করতেই জীবনের সূর্য কখন যে মধ্যগগণে চলে আসে, সেটা আর খেয়াল থাকে না। মাঝ বয়স চলে আসার পর দুপুরের উদাসীনতা মানুষের মনেও ভর করে। অবশ্য সব মানুষের ক্ষেত্রে যে একই রকম ঘটবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
চল্লিশে এসে জীবনে থিতু হওয়ার পর জীবন নিয়ে মানুষ হয়তোবা একটু ভাবার অবসর পায়। তখন নিজেদের পূর্বপুরুষ একে একে জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। আর তখনই তার টনক নড়ে যে একদিন তো আমাকেও হারিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে নিজেদের সন্তানাদি বড় হয়ে আগল থেকে বের হয়ে যেতে শুরু করে। এভাবে দুই দিক থেকেই মানুষ একা হতে থাকে। আর বুঝতে চেষ্টা করে জীবনকে। এটাকেই মনে হয় ইংরেজিতে মিড লাইফ ক্রাইসিস বলে। এই ক্রাইসিস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে মানুষ উদ্ভট সব কর্মকাণ্ড করতে থাকে। অবশ্য উদ্ভট বলাটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না, কারণ সেটাও একটা মানদণ্ডে আটকা পড়ে যাচ্ছে।
নিজের আয়নায় দেখে মাঝ বয়স নিয়ে কিছু উপলন্ধি হয়েছে। যেকোনো সময় ওপারের ডাক চলে আসবে। তাই সবকিছুই কেন জানি বাহুল্য মনে হয়। একসময় নিয়মিত লেখালেখি করতাম। এখন মনে হয় কী সব ছাইপাঁশ লিখছি। এর চেয়ে পড়া অনেক বেশি উপভোগ্য। কারণ, সভ্যতা সংস্কৃতি নিয়ে আসলে সবই বলা হয়ে গেছে। আমাদের যেহেতু পড়াশোনা বা জানাশোনা কম, তাই আমরা জীবন নিয়ে এত আক্ষেপ করি এবং উদ্বিগ্ন সময় কাটাই। এই সময় মানুষ আসলে নিজেকে খুঁজে ফেরে। তার কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না, সেগুলো নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। অনেকটা নিভৃতচারী জীবনযাপন করে। বন্ধুমহলের পরিধি ছোট হয়ে আসে। শুধু সমমনারাই তখন থেকে যায় আশপাশে।
মাঝ বয়সে একই সঙ্গে মনের পায়ে বেড়ি পড়ে আবার উদাসও হয়। কোনো কিছুতেই মন বসে না। কিছুই ভালো লাগে না। কোনো কিছুতে লেগে থাকার ধৈর্য থাকে না। অবশ্য সবার পরিবর্তন একই রকম হয় না। কোনো কারণে যে মন বিক্ষিপ্ত হবে, সে নিজেই জানে না। সেই বিক্ষিপ্ত মনকে কেন্দ্রীভূত করার জন্য এই লেখাটা শুরু করেছিলাম। সেটা শেষ করতে কয়েক দিন লেগে গেল, আগে যেখানে এক বসাতেই লেখা শেষ করে ফেলতাম। কী ভাবনা থেকে লিখতে বসেছিলাম, আর লেখাটা কোথায় গিয়ে শেষ হলো, জানি না। উপসংহারের লাইনটা কী হতে পারে। মানুষের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা? কিন্তু সেখানেও তো মানুষকে বড় করে দেখানো। অন্য সব প্রাণীর ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া। এই কর্তৃত্ববাদিতাই তো একদিন এই সভ্যতাকে ধ্বংস করবে। সেটা আজ হোক বা কাল। তাই নিজেদের শ্রেষ্ট জীব আর বলতে পারি না। দিন শেষে সেই একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—
‘এমন মানব জনম আর কি হবে।
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।’
