প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর নদীবিধৌত জনপদের ঐতিহ্য ধারণ করে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় গড়ে উঠেছে আমড়াচাষ ও বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ভাসমান আমড়ার হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৬০ হাজার কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ মেট্রিক টন উৎপাদনে এ মৌসুমে আমড়ার মোট উৎপাদন প্রায় ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি দুই উপজেলার নদীর মোহনায় কুড়িয়ানা, আটঘর, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি ও ভিমরুল এলাকায় আমড়ার উৎপাদন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট। এসব বাজারে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও সোমবার আমড়ার জমজমাট বেচাকেনা হয় এবং নির্ধারিত হাটের দিন ছাড়াও প্রতিদিন কমবেশি আমড়া বিক্রি হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে এখানকার সুস্বাদু ও মিষ্টি আমড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
কিন্তু সম্ভাবনাময় এই কৃষিপণ্য ঘিরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে স্বপ্ন দেখেন চাষিরা, তা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ন্যায্যমূল্যের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায়। নদীপথে নৌকাভর্তি আমড়া নিয়ে হাটে আসেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। সেখান থেকে পাইকারদের মাধ্যমে আমড়া পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি হলেও, যে আমড়া এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও ঐতিহ্যের অংশ, সেই আমড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারায় চাষিদের মধ্যে বাড়ছে চরম হতাশা। আমড়াচাষিদের অভিযোগ, জমির পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি, ফল সংগ্রহ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেশি হওয়া এবং এ বছর গরমে পচনশীল আমড়া দ্রুত পচে যাওয়ায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের লাভের কোনো টাকাই হাতে থাকছে না। আমড়াচাষি অমল আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘উৎপাদন যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে বাড়ছে না ফলের দাম।’ আরেক চাষি অমর জানান, আমড়ার ফলন ভালো হলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পেলে শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়।
চাষিদের প্রধান দাবি, নেছারাবাদে আমড়া সংরক্ষণের উপযোগী একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা, যাতে দ্রুত পেকে যাওয়া ও পচনশীল এই ফল দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে ফল বিক্রি করতে হয়। আরতদার সুভাষ বলেন, ‘কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকলে কৃষক দীর্ঘমেয়াদে চাষে আগ্রহ হারাবেন। আধুনিক হিমাগার বা উপযোগী নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।’ সুশীল সমাজের অভিমত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সংরক্ষণপ্রযুক্তি সবচেয়ে কার্যকর কি না তা কৃষি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা এবং নেছারাবাদের আমড়াচাষিদের জন্য নিয়মিত কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি। আধুনিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, ফলের গুণগত মানোন্নয়ন এবং উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া আমড়া থেকে আচার, চাটনি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে মৌসুমে অতিরিক্ত ফলের বিকল্প ব্যবহার তৈরি হবে, যা পচনশীল ফলের অপচয় কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, কৃষকেরা কৃষি কার্যালয়ে এসে আবেদন করলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ করা হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নেছারাবাদের আমড়াচাষ ও ভাসমান হাট কেবল কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই খাতের উন্নয়নে কৃষক, ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত আধুনিক হিমাগার স্থাপন ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় চাষি ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
