Published on
:
2 min read
হেমাভ সেনগুপ্ত, শান্তিনিকেতন
তখন কলা ভবনের অধ্যক্ষ তিনি। তবু যে সহকারী অধ্যাপকরা ক্লাসের রুটিন বানাতেন, তাঁদের যোগেন চৌধুরী বলতেন, 'ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস আমায় দিও। আমি ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ওদের মনের কথা বুঝতে চাই।' সে কথাই এখন বার বার শোনা যাচ্ছে যোগেন চৌধুরীর তৎকালীন ছাত্রদের মুখে। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি খ্যাতনামা শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন এক জন ছাত্রদরদি অধ্যাপক।
সে দিন যাঁরা যোগেন চৌধুরীর ছাত্র ছিলেন, তাঁদেরই একাংশ এখন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক হিসেবে কলা ভবনের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়তে দেখা গেল তাঁদের। সে দিনের ছাত্র এবং বর্তমানে কলা ভবনের অধ্যাপক দিলীপ মিত্র বলেন, 'আমি তখন গভর্নমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করি। দিল্লিতে ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্টে গিয়ে 'টাইগার ইন দ্য মুনলিট নাইট' শিরোনামে একটি ছবি দেখে মুগ্ধ হলাম। জানতে পারলাম, ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী। সংকল্প করেছিলাম, তাঁর কাছেই কাজ শিখব। তার পরে কলা ভবনে এসে ভর্তি হই। যোগেনদা তখন আমাদের মাস্টারমশাই। নিজের হাতে কাজ শিখিয়েছেন। ছাত্রদের পড়ানোর জন্য, তাঁদের যে কোনও রকম সাহায্যের জন্য সবার আগে যে মানুষটি এগিয়ে আসতেন, তিনি যোগেনদা।'
দুঃস্থ শিক্ষার্থীদের পাশে যোগেন চৌধুরীর দাঁড়ানোর কথা বার বার উঠেছে আসছে বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণে। তিনি বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনা করতে এলে তাঁর প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন শিশির শাহানা। বর্তমানে কলা ভবনের অধ্যাপক শিশিরের কথায়, 'যোগেনদা ছাত্রদের জন্য কী না করেছেন! নতুন ছাত্র ভর্তি হলে তার পরিবারের খোঁজ নিতেন। ছবি আঁকা নিয়ে তার মনের ইচ্ছের কথা জানতে চাইতেন। সেই ভাবেই গড়ে তুলতেন ভবিষ্যতের শিল্পীকে। শেষ জীবন পর্যন্ত ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন।' শিশিরের সংযোজন, 'শুধু ছাত্রছাত্রী বা সহকর্মীই নন, শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা হিসেবেও তিনি বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনও হয়েছে, গ্রাম থেকে দুঃস্থ মানুষ তাঁর শান্তিনিকেতনের বাড়িতে এসে সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দেননি।' যোগেন চৌধুরীর আরও এক ছাত্র বললেন, 'কোনও নতুন ছাত্রের প্রদর্শনীতে গেলে যোগেনদা ছবি না–কিনে কোনও দিন বাড়ি আসেননি। নতুন শিল্পীদের এ ভাবেই তিনি উৎসাহ দিতেন।'
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল গভীর। সেই সম্পর্ক কেবল শিক্ষকতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জড়িয়ে ছিল তাঁর শিল্পভাবনা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গেও। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের কলা ভবনে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন যোগেন। অবসর নেওয়ার পরেও কলা ভবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে যোগেন চৌধুরী দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন বিশ্বভারতীর সঙ্গে। তাঁর শিল্পকর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন পদ্মভূষণ-সহ একাধিক সম্মান। ললিতকলা অ্যাকাডেমির স্বীকৃতির পাশাপাশি ফ্রান্সেও সম্মানিত হয়েছেন তিনি।
শুধু শিল্পী হিসেবেই তাঁর সত্তাকে যোগেন চৌধুরী আগলে রাখেননি। পরিবেশ আন্দোলন ও সমাজ সংস্কারেও শান্তিনিকেতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। দীর্ঘ দু'দশক ধরে চলা 'খোয়াই বাঁচাও' আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন যোগেন চৌধুরী। মহাশ্বেতা দেবীর পাশাপাশি। সেই আন্দোলন চলাকালীন 'এই সময়'কে তিনি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, '১৯৬৩ সালে প্রথম যখন শান্তিনিকেতনকে দেখি, তখন এত প্রাচীর দেওয়া ছিল না। আমাদের সময়ে ছাত্র, অধ্যাপক ও উপাচার্য, সকলের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকত। উপাচার্যকে আমরা দাদা বলতাম। এখন সেই পরিবেশ আর নেই!' যোগেন চৌধুরীর এই মন্তব্যে ধরা পড়েছিল শান্তিনিকেতনের অতীতের মুক্ত পরিবেশের প্রতি তাঁর গভীর টান।
শান্তিনিকেতনে শিল্পীদের কাজের পরিসর তৈরি করে দিতে নব্বইয়ের দশকে যোগেন চৌধুরী, বিপিন গোস্বামী এবং জনক ঝংকার নার্জারি— এই তিন অধ্যাপক এবং তাঁদের ৯ জন ছাত্র মিলে গোয়ালপাড়ায় শুরু করেন 'স্বাদ' নামে একটি স্টুডিয়ো তথা আর্ট গ্যালারি। যা আজও সৃজনের অন্যতম কেন্দ্র।