আয়োডিন অভাবজনিত সমস্য একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ সমস্যা নিরসণকল্পে এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২১ অক্টোবর বিশ্ব আয়োডিন দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উদ্যোগে বিগত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব আয়োডিন দিবস উদযাপন করা হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিক ভবনে বিশ্ব আয়োডিন দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে ‘বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে আয়োডিনের গুরুত্ব’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত।
প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, দেশে এখনো ১২ শতাংশ মানুষ আয়োডিনের ঘাটতিতে ভুগছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এ সমস্যা সমাধানে আয়োডিনযুক্ত লবণের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
এক্ষেত্রে লবণ উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদনে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে বিসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বিসিককে লবণ উৎপাদনকারীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়োডিনের ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেন, লবণ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে দক্ষ জনবল বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের ওপর বিসিক গুরুত্ব প্রদান করছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে আয়োডিনযুক্ত লবণের বাজারজাতকরণে বিসিক সবসময় অঙ্গীকারবদ্ধ। পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে বিসিক দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিসিক সর্বাত্মক কাজ করে চলছে।
আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা আয়োডিনের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, আয়োডিন একটি অত্যাবশ্যকীয় অনুপুষ্টি। আয়োডিন মানুষের স্বাভাবিক, মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। দেশে অনুপুষ্টির অভাবজনিত সমস্যাগুলোর মধ্যে আয়োডিন ঘাটতিজনিত সমস্যা অন্যতম। আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড, হাবাগোবা, বামনত্ব, অকাল গর্ভপাত, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিত্বসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। ৯০ দশকের পূর্বে বাংলাদেশে আয়োডিন ঘাটতিজনিত সমস্যাসমূহ প্রকট আকার ধারণ করেছিল।
আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার ১৯৯০ সাল হতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিসিকের মাধ্যমে সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কার্যক্রমের অংশ হিসেবে লবণ মিলের নিবন্ধন প্রদান, মিলগুলোকে পটাশিয়াম আয়োডেট সরবরাহ, আয়োডিনযুক্ত লবণের মান নিয়ন্ত্রণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান, লবণমিল ও বাজার পর্যায়ে মনিটরিং এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। এ কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে দৃশ্যমান গলগণ্ড নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।
কোনো দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করলে সে দেশ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। সে স্বীকৃতি পেতে আমাদের আর বেশি দেরি নেই। আর মাত্র ২ শতাংশ মানুষকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসতে পারলেই আমরাও সে স্বীকৃতি অর্জন করব। সে উদ্দেশ্যেই এই আলোচনা সভা। দেশের মানুষকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসতে সচেতনতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ড. রুদাবা খন্দকার, কান্ট্রি ডিরেক্টর, গেইন, বাংলাদেশ; ডা. একেএম মুসা, কান্ট্রি ডিরেক্টর, এনআই, বাংলাদেশ এবং নুরুল কবির, সভাপতি, বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গুলজারুল আজিজ অনুষ্ঠানে বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে আয়োডিনের গুরুত্ব সম্পর্কে উপস্থাপন করেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, লবণ মিল মালিক, সাধারণ ভোক্তা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
