সিলেট ভয়েস ডেস্ক · ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড় হাওরে দেখা মিলেছে দুর্লভ পরিযায়ী পাখি বঘেরির। চড়ুইয়ের মতো দেখতে ছোট আকারের এই পাখি শীতকালে বাংলাদেশে আসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেলেও লাজুক স্বভাবের কারণে সহজে চোখে পড়ে না। পাখিটির ছবি তুলতে গিয়ে কয়েক বছর ধরে খোঁজাখুঁজির অভিজ্ঞতা হয়েছে একজন পাখিপ্রেমীর।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কানাইঘাটের বড় হাওরে গিয়ে বঘেরির দেখা পান তিনি। এর আগে ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের চটাইন্না খালপাড়ে এবং একই বছরের ২৫ নভেম্বর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা চা-বাগানের একটি ছোট পক্ষী অভয়াশ্রমে পাখিটির ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু হার্ডড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আগের ছবিগুলো হারিয়ে যায়। এরপর কয়েকবার টাঙ্গুয়ার হাওর ও কুরমায় গিয়েও পাখিটির দেখা পাননি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিলেটের বর্ষীয়ান পাখি সংরক্ষক শামীম খানের আমন্ত্রণে ‘বার্ডিংবিডি টুরস’-এর সঙ্গে কানাইঘাটের বড় হাওরে গিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল অতিবিরল পাতিসারসের সন্ধান করা। হাওরের বিলগুলোতে হাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলচর পাখি দেখা গেলেও সেদিন আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। সকাল থেকে মেঘলা আকাশ, পরে বৃষ্টি—সব মিলিয়ে পাতিসারসের দেখা মেলেনি। প্রায় ১৪ কিলোমিটার হেঁটেও কাঙ্ক্ষিত পাখিটির সন্ধান না পেয়ে ফিরতে হয়।
তবে পাতিসারসের খোঁজে গিয়ে বঘেরির দেখা পাওয়ায় সেই ভ্রমণ একেবারে বিফলে যায়নি। বিকেলে বড় হাওর থেকে বেরিয়ে পাকা সড়কে ওঠার সময় একটি সেতুর কাছে বিদ্যুতের তারে বসে থাকা বঘেরিকে দেখতে পান তিনি। দ্রুত ক্যামেরায় পাখিটির ছবি ধারণ করেন। আগের হারানো ছবিগুলোর মতো না হলেও নতুন করে বঘেরির ছবি পেয়ে খুশি হন তিনি।
বাংলাদেশে শীতের অতিথি বঘেরি
বঘেরির ইংরেজি নাম ব্ল্যাক-ফেসড বান্টিং (Black-faced Bunting)। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Emberiza melanocephala। এটি এম্বেরিজিডি (Emberizidae) গোত্রের পাখি। আকারে ছোট হওয়ায় দূর থেকে অনেকটা চড়ুইয়ের মতো দেখায়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ দশমিক ৫ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৩ থেকে ২৭ গ্রাম।
পাখিটির মূল বিস্তৃতি ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। শীতকালে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পরিযায়ন করে। এ সময় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকায় এর দেখা মেলে।
বঘেরির পুরুষ ও স্ত্রী পাখির পালকের রঙে পার্থক্য রয়েছে। প্রজননকালে পুরুষ পাখির মাথা কালো, গলা হলুদ এবং বুকের অংশ কমলা-বাদামি রঙের হয়। অন্যদিকে, স্ত্রী পাখির শরীরের ওপরের অংশ ধূসর-বাদামি এবং তাতে কালচে লম্বাটে দাগ থাকে। প্রজনন মৌসুমের বাইরে পুরুষ পাখির রংও অনেকটা অনুজ্জ্বল হয়ে আসে।
ঝোপঝাড়ে থাকতে পছন্দ করে
বঘেরি সাধারণত জলাভূমির আশপাশের উঁচু ঘাস, ঝোপঝাড়, ধানখেত এবং বড় গাছের নিচে লতাগুল্মপূর্ণ এলাকায় বিচরণ করে। একা, জোড়ায় কিংবা ছোট দলে দেখা যায়। অন্য প্রজাতির বঘেরির সঙ্গেও মিশ্র দলে থাকতে পারে। লাজুক স্বভাবের কারণে বেশির ভাগ সময় ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকে; মাঝেমধ্যে খোলামেলা জায়গায় বেরিয়ে আসে।
ঘাসের বীজ, শস্যদানা ও পোকামাকড় পাখিটির প্রধান খাবার। শীতকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়।
বঘেরির প্রজননকাল মে থেকে জুন। এ সময় প্রজনন এলাকায় মাটিতে কিংবা নিচু ঝোপের গোড়ায় ঘাস দিয়ে কাপের মতো বাসা তৈরি করে। বাসার ভেতর চুলসহ নরম উপাদান দিয়ে গদি তৈরি করে। সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিমে ফ্যাকাশে রঙের ওপর বাদামি দাগ থাকে। প্রায় ১২ থেকে ১৪ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ছানারা ৯ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উড়তে শেখে বলে পাখিটির জীবনচক্রবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে বঘেরির উপস্থিতি স্থানীয় জলাভূমি ও আশপাশের ঘাসভূমিতে পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তবে একটি স্থানে পাখিটির দেখা পাওয়া মানেই সেখানে নিয়মিত বিচরণ বা স্থায়ী আবাস রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
