সার্বিয়ার রাজনীতিতে আলেক্সান্ডার ভুচিচের ১৪ বছরের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে শিক্ষার্থীদের সমর্থনপুষ্ট দল ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। দলটির প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর, রসায়নের অধ্যাপক ও খ্যাতিমান বাস্কেটবল তারকার মতো ব্যক্তিত্ব। প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের বদলে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ায় দেশটির নতুন পার্লামেন্টের চেহারা বদলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির প্রাথমিক হিসাবে, স্টুডেন্ট লিস্ট প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টের ২৫০টি আসনের মধ্যে ১৪১টি। অন্যদিকে, ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি পেয়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট।
তবে এই দলের বিশেষত্ব শুধু নির্বাচনি সাফল্যে নয়, প্রার্থী বাছাইয়ের ধরনেও। গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, তালিকার ২৫০ প্রার্থীর মধ্যে ১৬০ জনের বেশি পিএইচডি ডিগ্রিধারী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাদের কেউই সরাসরি শিক্ষার্থী নন। দেশজুড়ে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অবসানের দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীরাই তাদের বেছে নিয়েছেন।
কারা রয়েছেন স্টুডেন্ট লিস্টে?
দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ইলিয়া স্রদানোভিচ। অর্থনীতিবিদ দেজান শোশকিচ ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। তালিকায় রয়েছেন বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক এবং সার্বিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসের সদস্য রাদোমির সাইচিচও।
এ ছাড়া সাবেক সার্বীয় বাস্কেটবল তারকা ও ইউরোলিগ বাস্কেটবলের বর্তমান সভাপতি দেজান বোদিরোগা এবং বিদায়ী সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত সমাজবিজ্ঞানী জোভো বাকিচ রয়েছেন তালিকায়।
প্রার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, কৃষক ও আন্দোলনকর্মীরাও আছেন। বিভিন্ন পেশার মানুষের এই সমাবেশের মাধ্যমে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে একটি বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সংগঠনটি।
তবে দলটি কোনো একক নেতাকে সামনে রাখেনি। প্রধানমন্ত্রী পদে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নতুন সরকার কে নেতৃত্ব দেবেন এবং ক্ষমতা কীভাবে ভাগাভাগি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্রচলিত পার্লামেন্টের চেয়ে কী আলাদা?
বেশির ভাগ সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠিত সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। সাধারণত দলীয় প্রধান, জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও অভিজ্ঞ আইনপ্রণেতারা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন। নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব, দলীয় আদর্শ ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পায়।
সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্ট এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ নিয়েছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ সংগঠিত করা শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছেন। তাদের অনেকেরই নির্বাচনী রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা সীমিত।
দলটি কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অবশ্য অন্য দেশগুলোর পার্লামেন্টে উচ্চশিক্ষিত আইনপ্রণেতা বা বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগ নেই, এমন নয়। আবার শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি হলেই সুশাসন নিশ্চিত হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। সার্বিয়ার এই দলের স্বাতন্ত্র্য হলো প্রার্থী বাছাইয়ে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা, প্রচলিত দলীয় নেতৃত্বের ওপর সীমিত নির্ভরতা এবং শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের ব্যাপক উপস্থিতি।
সব প্রার্থীর চূড়ান্ত নির্বাচনী অবস্থান ও যোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই নতুন পার্লামেন্টের শিক্ষাগত গঠন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে। তবে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের অন্যতম উচ্চশিক্ষিত আইনপ্রণেতাদের সমন্বয়ে গঠিত পার্লামেন্ট হতে পারে এটি।
রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তন
২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার পর থেকেই দলটির উত্থান। নির্মাণকাজের মান, দুর্নীতির অভিযোগ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ শুরু করেন। পরে আন্দোলনটি ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। ২০১৪ সাল থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল তার প্রশাসন।
সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
