ছবির ক্যাপশন: .
>> মো. ছাব্বির হোসাইন
ঋতুচক্রে এখন শীতকাল। একটা সময় ছিলো আবহমান বাংলার গ্রাম-গঞ্জে এই সময়টাতে চলতো পিঠা-পুলি বানানোর উৎসব। খেজুর গাছ থেকে আহরণ করা হতো খেজুরের রস। তা দিয়ে তৈরি হতো সুস্বাদু রসের পায়েস আর মজাদার মিঠাই ও পিঠা। শহরে যারা বাস করেন এই সময়টাতে তারা নিজেদের ছেলে-মেয়ে ও পরিবার নিয়ে যার যার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যেতেন। এই কংক্রিটের শহর থেকে বের হয়ে প্রকৃতি ও শীতের আমেজ লাভের জন্য তারা গ্রামে যেতেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় বিংশ শতাব্দীর আশি'র দশক পর্যন্ত এ ধারাটা প্রবলভাবে দেখা গেছে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই চিরাচরিত নিয়মের ছন্দপতন ঘটেছে। শীতে সপরিবারে গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার রীতি এখন সেভাবে দেখা যায় না। শহুরে মানুষগুলো বন্দী কংক্রিটে গড়া চার দেওয়ালের ভিতর। কেউ কেউ আবার দেশের বাহিরে বেড়াতে যান। তবে তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য। সামর্থ অনুযায়ী কিছু কিছু মানুষ শহরের আশে পাশে ভ্রমণ করেন। কেউ বা ডে ট্যুর আবার কেউ বা রিসোর্টে এক-দুই দিনের রাত্রিযাপন করেন। অনেকে পছন্দ করেন পর্যটন শহর খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবন, কুয়াকাটা বা চায়ের রাজধানী সিলেট যেতে। ভ্রমণ পিপাসুদের কেউ কেউ ঘুরতে পছন্দ করেন উত্তরবঙ্গের জেলা রাজশাহী-বগুড়া কিংবা সর্ব উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়।
এসব ট্যুরে পাওয়া যায় না এই তো ১৫-২০ বছর আগে গ্রামে বেড়ানোর সেই আমেজ। কতই না আনন্দময় ছিলো গ্রামে বেড়ানোর সে দিনগুলো। শীতের সময় শীত নিবারনের জন্য গ্রামের মানুষের তেমন জামা কাপড় ছিলো না। বড়জোর একটা চাদর পেঁচিয়ে শীত থেকে তারা রক্ষা পাবার চেষ্টা করতেন। শীতে কাতর মানুষগুলো সকাল-সন্ধ্যায় খড়কুটো জ্বালিয়ে দলবেঁধে আগুন পোহাতেন, চলতো তাদের সুখ-দুঃখের যত আলাপচারিতা। পড়ন্ত বিকেলে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য গাছিরা খেজুর গাছে ঠিলা দিতেন। পরদিন সকালবেলা সে ঠিলা রসে ভরে যেতো। কখনো কখনো দুষ্ট ছেলের দল ঠিলাতে পাট খড়ি ঢুকিয়ে রস টেনে খেয়ে ফেলতো। আবার কেউ কেউ গুলতি দিয়ে ঠিলা ফুটো করে রস খেত। যা ছিলো তাদের কাছে এক অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চার। আমিও বন্ধুদের সাথে রস চুরি করে পায়েস করে খেয়েছি কয়েকবার। অবশ্য সকালে গাছিকে মূল্য পরিশোধ করে দিতাম আমরা।
গাছ থেকে সংগ্রহ করা খেজুর রস একদিন গেরস্থ এবং এক দিন গাছি ভাগাভাগি করে নিতেন। রস দিয়ে গৃহিণীরা তৈরি করতেন হরেক রকম মিষ্টি পিঠা যেমন রস চিতই, ধুপি পিঠা, পাটি সাপটা, মুগ-পাকন, রস পিঠা, ইত্যাদি নানা ধরনের মজার পিঠা। কোনো কোনো দিন রস দিয়ে তৈরি করা হতো খেজুরের মিঠাই। বিশাল বড় আকারের পাত্রে দীর্ঘ সময় জ্বাল দিয়ে প্রস্তুত করা হতো মিষ্টি স্বাদের খেজুরের মিঠাই।
জানা যায়, সত্তর আশি দশকে গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ ঘর ছিলো কাঁচা ঘর। পাট খড়ি, বাঁশ ও ছন এবং টিন দিয়ে তৈরি ঘরগুলো যেন ঠিক পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের আসমানীদের ঘরের মতো। যেখানে বৃষ্টির দিনে বৃষ্টি আর শীতের দিনে কুয়াশা ঘরগুলোতে হানা দিতো। অবস্থাপন্ন গেরস্থের ঘর গুলো ছিলো টিন ও কাঠের তৈরি। শীতের রাতে গ্রামের মানুষ লেপ, কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতেন। সেই কাঁথায় শীত নিবারণ হতো না। কারো কারো ভাগ্যে সেই কাঁথাও জুটতো না।
শীতের সময় গ্রামে ওয়াজ-মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে সেখানে বসতো অস্থায়ী দোকানপাট। দোকানীরা নানা রকম পসরা সাজিয়ে বসতেন। মুরালী, নিমকি, জিলাপী, রসগোল্লা, চকলেট, চানাচুরসহ অনেক কিছু সেখানে পাওয়া যেতো। মনে হতো মেলা বসেছে।
বাংলার গ্রামগুলোতে আজ সেই চিরচেনা চিত্র হারিয়ে গেছে। গাছিরা এখন খেজুর গাছ থেকে তেমন রস সংগ্রহ করে না। গৃহিণীরা আগের মতো পিঠা পুলি বানায় না। গ্রাম এখন শহর কেন্দ্রিক। আগে শহরের মানুষ গ্রামে যেতো আর এখন গ্রামের মানুষ শহরে যায়। শহরের মানুষ ছুটি কাটাতে ছোটে দেশের বাহিরে কিংবা শহর থেকে দূরে কোনো রিসোর্টে অথবা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন বা অন্যকোন পর্যটন স্থানে।
এই হালের কারণ কি? এক কথায় উত্তর পাওয়া যাবে না। তবে বৈশ্বিক এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এর মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়।
আমার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার অন্তর্গত বাঘাজোড়া গ্রামে। ছোটবেলায় দেখেছি আমার চাচা খেজুর গাছ কাটতেন। গাছ কাটার সময় মাথি দিতেন আমাদের। আমরা তার পিছু পিছু ছুটতাম মাথি খাওয়ার জন্য। দারুন মজা! এখনও খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু খাওয়া হয় না বহুকাল। আমার চাচাও আর বেচে নেই। গ্রামের অন্যান্য গাছিরাও এখন গাছ কাটা একপ্রকার বাদ দিয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, গাছির কাজ খুবই ঝুঁকিপুর্ণ ও কষ্টসাধ্য। সে তুলনায় পারিশ্রমিক অনেক কম। সে সাথে যুক্ত হয়েছে খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ।
দাদি-নানি, চাচি-মামিরা ১৫-২০ বছর আগে রাত-ভোর পীঠা বানাতেন এবং তাদের আত্মীয়-পরিজনদের আপ্যায়ন করাতেন। প্রতিটি পিঠার সাথে মিশে থাকতো তাদের পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। তারা ছিলেন সত্যিকার অতিথিপরায়ন মানুষ। আপ্যায়ন করাতে তারা দারুন ভালোবাসতেন।
সময়ের সাথে সাথে এই রীতির পরিবর্তন হয়েছে। পিঠা তৈরি অনেক সময় সাপেক্ষ, সেই সাথে ব্যয়বহুলও বটে। এতো সময় এই সময়ের গৃহিণীদের হাতে নেই।এমনিভাবে একদিন হারিয়ে যাবে শীতের সময়ে গ্রামে বেড়ানোর রেওয়াজ। হারিয়ে যাবে আমাদের চিরায়ত বাংলার পিঠা-পুলি খাওয়ার উৎসব। বিলীন হয়ে যাবে গাছিদের খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।
লেখক : কবি, কলামিস্ট, সাংবাদিক।
