মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর পাল্টাপাল্টি হামলাকে কেন্দ্র করে। সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার পর ইয়েমেনে পাল্টা আঘাত হেনেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। একই সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে তেহরান। এদিকে, সংঘাতের প্রভাবে সমুদ্রে আটকে পড়া ৪০ ইরানি নাবিককে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়ার পর দেশে ফেরত পাঠিয়েছে শ্রীলঙ্কা।
সৌদি স্থাপনায় হুথিদের হামলা, পাল্টা আঘাত ইয়েমেনে : সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পৃথক তিনটি হামলা চালানোর দাবি করেছে হুথি গোষ্ঠী। এসব ঘটনায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি আবাসিক ভবন ও সাতটি যানবাহন। হুথিদের দাবি, রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি বিমান ও নৌঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র ও দুটি চালকবিহীন আকাশযান প্রতিহত করেছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পবিত্র মক্কা ও মদিনা ছাড়া দেশটির অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হতে পারে বলে সতর্ক করেছে গোষ্ঠীটি। একই সঙ্গে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে অনিরাপদ দাবি করে কর্মী ও যাত্রীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে তারা। জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও হুথি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জোটের দাবি, হুথিদের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে এক দিনে ৫৬টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় পাঁচটি সুড়ঙ্গ ও চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে হামলায় হতাহতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় তেহরানে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক : সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতের মধ্যেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনায় বসছেন ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিনের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাদের আলোচনা হওয়ার কথা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাকায়ি এই উদ্যোগকে অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীও এক সরকারি সফরে আসিম মুনিরের তেহরানে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে যৌথ নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে এই বৈঠককে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ তারা মেনে নিতে চান না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে তেহরানের আপত্তি অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনড় তেহরান : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ¦ালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই জলপথের চলাচল ও ব্যবস্থাপনা আগের অবস্থায় ফিরবে না। নতুন ব্যবস্থায় ইরানের তত্ত্বাবধান থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ¦ালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরে প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের মধ্যে এই জলপথ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। নৌ চলাচল সীমিত বা বাধাগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ¦ালানি রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, ইরানে কঠোর হামলার হুমকি দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতের মধ্যে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইসরাইলের নির্বাচন নিয়ে নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা : ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা করা হলে ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু বলেছেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা প্রতিহত করতে ইসরাইলি বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তবে সম্ভাব্য হামলা বা হস্তক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন ও জেনিন শহরে ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেবরন থেকে ৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। শহরের প্রবেশপথগুলোও বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিম তীরে অভিযান এবং ইরান ঘিরে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগÑ দুই ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
অসুস্থ ৪০ ইরানি নাবিককে উদ্ধার শ্রীলঙ্কার : মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে সমুদ্রে অবস্থানরত ইরানি জাহাজগুলোর নাবিকদের নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ৪০ জন অসুস্থ ইরানি নাবিককে উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা।
উদ্ধার করা নাবিকদের জাহাজ থেকে তীরে এনে রাজধানী কলম্বোয় নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার চেষ্টা শ্রীলঙ্কার : চলমান সংঘাতে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির কর্তৃপক্ষ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বিবেচনায় বিপদে পড়া নাবিকদের সহায়তা দেওয়া হলেও জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এর আগে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ইরানি নৌযান ডুবে যাওয়ার ঘটনায় উদ্ধারকাজ চালানো হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিরোধ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল। তেহরানের বৈঠক থেকে কোনো সমঝোতার পথ বের হয় কি না, তার ওপর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ¦ালানি পরিবহনের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
