বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কক্সবাজারের রামুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘কল্পজাহাজ ভাসা ও ফানুস উৎসব’। ব্যতিক্রমী ও বর্ণিল এ উৎসবকে ঘিরে বাঁকখালী নদীর চেরাংঘাটা এলাকায় দুই তীরে বসেছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলা। প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদ-২০২৬-এর উদ্যোগে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
সোমবার দুপুর গড়াতেই রামুর চেরাংঘাটায় বাঁকখালী নদীর তীরে শুরু হয় প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের বর্ণিল আয়োজন। নদীর পানিতে ভাসতে থাকে বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে সজ্জিত সাতটি কল্পজাহাজ। জাহাজগুলো ঘিরে নাচে-গানে মেতে ওঠেন বৌদ্ধ তরুণ-তরুণীরা। তারা বুদ্ধসংকীর্তন গেয়ে নদীর পানিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ান।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে ভগবান গৌতম বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে অবস্থানকালে বৈশালী রাজ্যে অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ও খরা দেখা দিয়েছিল। এর প্রভাবে মানুষসহ বিভিন্ন জীবজন্তু মারা যাচ্ছিল। তখন রাজার আমন্ত্রণে শিষ্যদের নিয়ে গৌতম বুদ্ধ বৈশালী রাজ্যে যান। সেখানে ‘রত্নসূত্র’ পাঠ করে অপদেবতাদের কুপ্রভাব থেকে রাজ্যটিকে রক্ষা করেন তিনি। সেখান থেকে ফেরার পথে নাগরাজ ৫০০টি সুসজ্জিত নৌকায় শিষ্যদেরসহ বুদ্ধকে নদী পার করে দেন। সেই স্মৃতিকে স্মরণ করেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব পালন করেন। তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন রামুর বাঁকখালী নদীর তীরে দুই শতাধিক বছর ধরে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
উৎসবে অংশ নেওয়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বলেন, গৌতম বুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণ করতেই তারা এ আয়োজনে শামিল হয়েছেন। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হলেও এটি এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনোৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে, জাতিতে-জাতিতে এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে তারা আনন্দে মেতে উঠেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এ উৎসব সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখবে।
আয়োজকেরা জানান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জনপদ রামুতে প্রায় দুই শত বছর ধরে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধপল্লি থেকে সাতটি কল্পজাহাজ ভাসানো হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এ সময় তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষে ঠেলে দিতে চায় না সরকার। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আমাদের এই রাষ্ট্র নয়। সব ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মিলেমিশে থাকতে চান। সকলে মিলে একটি ছাতার নিচে বাস করতে চান। সেই ছাতাটার নাম হচ্ছে বাংলাদেশ।
ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবকে ঘিরে রামু পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলনোৎসবে। জাহাজ ভাসা উৎসব শেষে ভগবান গৌতম বুদ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও প্রার্থনার অংশ হিসেবে ওড়ানো হয় ফানুস বাতি।
যে আই
