সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ জিনোম বিশ্লেষণ এবং প্রান্তিক নারী কারিগরদের অসামান্য দক্ষতায় রূপকথার ইতিহাস ভেদ করে বাস্তবে ফিরে এসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। কাঁচামাল ও আদি প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর কিংবদন্তির ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’ হিসেবে খ্যাত এই শিল্প এখন বিশ্ববাজারে বাণিজ্যিক বিস্তারের দ্বারপ্রান্তে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্যে ঢাকাই মসলিন প্রথম সারির আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হতো। মুঘল শাসনামলে এর খ্যাতি এমন শিখরে পৌঁছায় যে এর শ্রেষ্ঠ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ কেবল সম্রাটদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এছাড়া বিভিন্ন নকশা ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে আবে-রওয়ান কিংবা শবনমের মতো কাব্যিক নামে পরিচিত ছিল এই মসলিন। একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি দিয়াশলাইয়ের খোলে এঁটে যাওয়া কিংবা আংটির ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে টেনে নেওয়ার প্রচলিত গল্পগুলো এই কাপড়ের অকল্পনীয় সূক্ষ্মতারই ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।
তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ম্যানচেস্টারের সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, তাঁতিদের ওপর নির্মম নিপীড়ন ও শাস্তিমূলক শুল্কের বোঝায় এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে মেঘনা অববাহিকার বিশেষ তুলা ‘ফুটি কার্পাস’ প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হলে ১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষ প্রদর্শনের পর মসলিন কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি হয়ে যায়। বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী আর্দ্র পরিবেশ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল এই লোকজ বিজ্ঞানে তুলা প্রস্তুত থেকে শুরু করে বোয়ালের চোয়ালের হাড় দিয়ে আঁশ পরিষ্কার এবং তকলিতে সুতা কাটাসহ ১৬টি সুনির্দিষ্ট ধাপ অতিক্রম করে একটি আসল মসলিন তৈরি করা হতো।
দীর্ঘকাল পর ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ গবেষক দল মসলিন পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের ১৭৮৮ সালের প্রকাশনার সূত্র ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্য তুলার ৩৯টি জাত সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সাথে ডিএনএ ও জিনোম ম্যাচিং সম্পন্ন করে নিখুঁত ‘ফুটি কার্পাস’ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই কাজের জন্য মসলিনের আদি ৫০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রপাতি নতুন করে তৈরি করা হয়। সাধারণ কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০ হয়ে থাকে, সেখানে পুনরুজ্জীবিত মসলিনের সুতার কাউন্ট দাঁড়িয়েছে ৭৩১ থেকে ৭৫০ পর্যন্ত। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা পায়।
বর্তমানে গবেষণাগার ছাড়িয়ে মসলিনের বাণিজ্যিক রূপ দিতে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিন শতাধিক প্রান্তিক নারীকে নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ স্পিনারে রূপান্তর করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পাওয়া ৫০০ গজ কাপড়ের একটি বড় রপ্তানি আদেশ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশগুলোর বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এই কাপড়ের ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’-এর মাধ্যমে প্রযুক্তিটি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। কাঁচামালের জোগান অব্যাহত রাখতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার কৃষকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। একটি শাড়ি তৈরিতে একাধিক তাঁতির কয়েক মাসের শ্রম প্রয়োজন হওয়ায় বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ভবিষ্যতে তা এক থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রচলিত তৈরি পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে অতি-উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন পণ্যের রপ্তানিকারক হিসেবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এই পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন।
