দেশের প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ শিল্পে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার দক্ষ জনবলের চাহিদা থাকলেও স্থানীয়ভাবে তা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও চীন থেকে কর্মী নিয়োগ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ শাহরিয়ার।
সোমবার রাজধানীর বনানী ক্লাবে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ‘স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য টেকসই ও মানসম্মত প্যাকেজিং’ শীর্ষক এ কর্মসূচির আয়োজন করে বিপিএএমইএ ও এশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশন (এপিএফ)।
শাহরিয়ার বলেন, বিশ্ববাজারে প্যাকেজিং শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে বাংলাদেশের অংশ খুবই সামান্য। ব্লুমবার্গের হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বিশ্বে কাগজভিত্তিক প্যাকেজিংয়ের বাজার প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের। আর সামগ্রিক প্যাকেজিং বাজারের আকার ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
দীর্ঘদিন অবহেলা ও পর্যাপ্ত নীতিসহায়তার অভাব সত্ত্বেও দেশের উদ্যোক্তারা এ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে প্যাকেজিং উপকরণ ও অ্যাকসেসরিজ সরবরাহ করে তাঁরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।
শাহরিয়ার বলেন, দেশের বিশ্বমানের তৈরি পোশাকশিল্পের প্যাকেজিং চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব। তবে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এ খাত রপ্তানিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আরও সহযোগিতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, প্যাকেজিং ও মুদ্রণশিল্পে ব্যবহৃত একটি যন্ত্রের দাম ২০ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। অথচ এসব মেশিন চালানোর জন্য দক্ষ জনবল তৈরির জন্য দেশে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণসুবিধা ও সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম নেই।
শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাক্রম তৈরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে বিপিএএমইএ। এ খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ্যক্রম সাজাতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মুদ্রণ, প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজকে কেবল সহায়ক খাত হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন শাহরিয়ার। তাঁর মতে, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের দিকে এগোনোর আগে শিল্পের জন্য অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিটিএমএ) সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
দেশে উৎপাদিত অ্যাকসেসরিজ ও ট্রিমসের ক্ষেত্রেও বিনা মূল্যে সরবরাহের (এফওসি) সমান সুযোগ চান শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে এফওসি সুবিধায় অ্যাকসেসরিজ আনা গেলে দেশীয় উদ্যোক্তারা একই সুবিধায় সরবরাহ করতে পারবেন না কেন?’
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একই সময়ে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের রপ্তানি বেড়েছে। রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঐক্য এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভারত স্থগিত করায় দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা ও এনবিআরের নীতিগত অস্পষ্টতা ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হওয়া এবং স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধের কারণে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর স্থলবন্দর দিয়ে পার্সেল পাঠানোর সুবিধা চালু হলেও পরে ওই পথে সুতা আমদানির সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করলে রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন বলে জানান তিনি।
ফারুক হাসান বলেন, একসময় ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা কমে ৫০ কোটি থেকে ৬০ কোটি ডলারে নেমেছে। ভবিষ্যতে এ বাজারে রপ্তানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমদানি ও পণ্য পরিবহনসংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রপ্তানি খাতে এর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য পরিবহনে বিধিনিষেধ উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএপিএমইএর সাবেক সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন মতিও বক্তব্য দেন।
