কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা নিয়ে যখন চারদিকে তোলপাড় চলছে, ঠিক সেই সময়েই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার হাতে নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিতর্কিত পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান। গত রবিবার উখিয়া থানায় হাজির হয়ে তিনি নিজেই এই পুরস্কার প্রদান করেন। এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আত্মসাতের অভিযোগে উখিয়া উপজেলার বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়াকে নিয়ে যখন তোলপাড় চলছে, ঠিক সেদিনই প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়া থানায় গিয়ে তাঁর হাতে নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কক্সবাজারের ‘বিতর্কিত’ পুলিশ সুপার। রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ওই পুলিশ কর্মকর্তার ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও তুমুল সমালোচনা হয়। শুধু তাই নয়, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই মিলেছে ইয়াবার গুদাম। তবে অভিযোগ প্রকাশের দিনই অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কৃত করার ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিতর্কিত ভূমিকা। পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকে নানা অপকর্মে জড়িত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শাস্তির বদলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন এই পুলিশ সুপার।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তদন্ত বা কোনো ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে পুরস্কৃত করার ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি এই সিদ্ধান্তের জেরে খোদ এসপির ভূমিকাই এখন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও একই অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও পর্যটন এলাকাসহ জেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।
গত ২২ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এসআই গোলাম কিবরিয়া। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সরোয়ার সিকদারের দাবি, অভিযানে দেড় লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া গেলেও মামলা নথিবদ্ধ করার সময় মাত্র ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ দেখানো হয়েছে। বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়, যা পরবর্তীতে মাদক কারবারিদের কাছে এক কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসআই কিবরিয়াকে বাদী করে দায়ের করা মামলার এজাহারে মাত্র ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি কাগজে-কলমে দেখানো হয়। তবে অভিযানের সময় সেখান থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে পুরো জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। অভিযোগ আছে, ইয়াবা গায়েবকারীকে খুঁজে বের করতেও এসপির কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে দেড় শতাধিক। তবে অনেক ঘটনায় মামলা বা জিডি না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানে উঠে আসছে না। এতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তদন্তের খাতিরে মামলার এজাহার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, সেই দেলোয়ার ও সাদ্দাম জানিয়েছেন, তারা পুলিশের এমন কোনো অভিযান বা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে কিছুই জানেন না। তাদের অজান্তেই সাক্ষীর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দতালিকা ও সিসিটিভি ফুটেজ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলে উদ্ধারকৃত ইয়াবার সঠিক হিসাব বেরিয়ে আসবে। পুলিশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মাসিক সভায় সর্বোচ্চ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। এমনকি মামলায় সাক্ষী হিসেবে তাঁদের নাম থাকার বিষয়েও তাঁরা অবগত নন বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন।
পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, ২২ অক্টোবর ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি হিসেবেই এসআই কিবরিয়া ও ওসিকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, একই অভিযানে এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হওয়ার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও পুলিশ সুপার এই পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে পুরস্কার দেওয়া হবে তা সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী এবং এটি বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এসপি এএনএম সাজেদুর রহমান কোনো সাড়া দেননি। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলায় এসপি সাজেদুর রহমানের দায়িত্বকাল নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে চরম অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তার যোগদানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। সাম্প্রতিককালে দিনদুপুরে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে অর্ধশতাধিক যানবাহনে গণডাকাতির ঘটনা এর অন্যতম উদাহরণ। এছাড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থাকা ইয়াবার গুদাম থেকে উদ্ধার হওয়া তিন লাখ পিস ইয়াবার অভিযানেও দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, যার কোনো তদন্ত বা সুরাহা হয়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৯৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিচারককে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভয় দেখানোর অভিযোগের পাশাপাশি গত ২৪ মে আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তার চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল দেখিয়ে একজন বিচারককে ভয় দেখান বলে জানিয়েছেন জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। এর মধ্যে গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম হত্যাসহ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম।
খোরশেদ আলম হত্যার পর তারিন নামের এক নারীকে আটক করা হলেও পুলিশের এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে নির্দোষ দাবি করা হয়।
পরে তার পরিবারের অনাস্থার প্রেক্ষিতে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরিত হয়।
এছাড়াও সাংবাদিক অন্তর দে বিশালকে ভয় দেখানো ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এসপির আস্থাভাজন এলআইসি সদস্য সোহেলের বিরুদ্ধে। ইয়াবা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সময় অন্য একজন স্থানীয় সাংবাদিককেও পুলিশ সুপারের নেতিবাচক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানা যায়।
The post অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি এসআইকে পুরস্কৃত করলেন কক্সবাজারের এসপি সাজেদুর রহমান appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
