‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গ ভরা’- বাংলা সাহিত্যে যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বর গুপ্ত এমন একটা কথা বলেছিলেন, তা’ প্রায় ৩০০ বছর আগে। যখন অবিভক্ত ভারতে আসাম ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব বঙ্গ মিলে ‘বঙ্গদেশ’ ছিল, সেই সময়কার কথা। তারপর পদ্মা মেঘনা যমুনায় কত জল গড়ালো! ভারত ভাগ হলো, পূর্ব বাংলা বঙ্গ দেশ থেকে খণ্ডিত হলো, পরে তার নাম হল বাংলাদেশ। তবুও রং তামাশার যেন শেষ নেই।
বাংলাদেশে ইদানীং কালে উসকানিমূলক বক্তৃতা দেওয়া ভারতের মদদপুষ্ট চৈতালী চক্রবর্তীর কথা বলছিলাম। স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সে এখন বাংলাদেশকে খণ্ডিত করার স্বপ্ন দেখছে। পৃথক হিন্দু প্রদেশ করার কথাও বলছে। যতটুকু পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে, সে নাকি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী! সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাষ্ট্রদ্রোহী এই ভদ্র মহিলার মুখের উচ্চারণ সম্পূর্ণ দেশ দ্রোহী। এই ভদ্রমহিলার এতই হ্যাডম, এতই দাপট যে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও বাক্ স্বাধীনতার নামে দেশ বিভাজনের হুংকার দিয়ে অনেক উস্কানি মূলক কথা একের পর এক বলে চলেছেন। দেশের সরল নিরীহ জনগণ বক্তৃতার নামে তার অসহনীয় ‘খিস্তি খেউড়’ শুনে রীতিমতো বিস্মিত হতভম্ব ও আতঙ্কিত।
সুপ্রিম কোর্টের কথিত আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তীকে আমরা হাসিনার দুঃশাসন আমলে ‘তেলাপোকার মতো’ কোথাও হাঁটতে চলতে দেখিনি, হুংকার তো দূরের কথা ! হাসিনার শাসন আমলে যখন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া তে, যশোরের অভয় নগরে সরকার দলীয় লোকজনেরা সনাতনী জনগণের উপর নৃশংস নির্মম হামলা চালায়, গুজব রটনা হয় অন্য স্টাইলে। তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর উপর বদনাম করে। পরবর্তীতে মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃস্থানীয় লোকজন ব্যাপকভাবে সরেজমিন তদন্ত করে জানতে পারেন, মন্দিরে হামলা, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, সবই ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা করে বেড়াচ্ছে। বদনাম হচ্ছে বিরোধী দলের। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানবাধিকার কমিশন তদন্তকালে এলাকাবাসীরা জানান এসব কাজ হাসিনা সরকারের মদদ পুষ্টরা করে বিরোধীদলের উপরে দায় চাপাচ্ছে। এলাকাবাসীরা চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাম তদন্ত কমিশনের কাছে তুলে ধরে। অথচ স্বৈরশাসক স্বৈরিণী হাসিনা কোন কিছু নিজের দলেরা ঘটালেও তদন্ত হওয়ার আগেই দিব্যি বলে দিত, এসব বিএনপি জামাতের বিরোধী দলীয় সন্ত্রাসীদের(?) কাজ। তখন এ ধরনের কুৎসিত ঘটনা সরকারি ছত্রছায়ায় হর হামেশা ঘটলেও দেশবিরোধী এইসব চৈতালি চক্রবর্তীরা তখন মুখে কুলুপ আটা ছিল।
মিথ্যে প্রপাগান্ডা রটানো ঘৃণ্য নারী প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন জুলুম চলছে এ ধরনের একটি বয়ান তৈরি করে জল জ্যান্ত মিথ্যে বলে বাংলাদেশের দুর্নাম করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম কে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছিল। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বর্তমানে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী দল আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা তখন ক্ষমতাসীন। হাসিনা সরকারের একটি প্রাণীও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এর কাছে প্রিয়া সাহার এ ধরনের মিথ্যে নালিশের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি। এত বড় অভিযোগের বিরুদ্ধে কথা না বলা অর্থাৎ মৌনতা অবলম্বন করা, অভিযোগটিকে অনুমোদন দেওয়া বা সম্মতির লক্ষণ বলে আমরা ধরে নিতে পারি। হাসিনা সরকারের আমলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর কাছে প্রিয়া সাহার নালিশের কথা, বাংলাদেশ নিয়ে এমন অপযশ সর্বত্র চাউর হওয়া সত্ত্বেও হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথাকথিত ডক্টর আব্দুল মোমেন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ স্বরূপ একটি কথাও বলেন নাই। হাসিনা সরকার এ ধরনের আজগুবি মিথ্যে প্রোপাগান্ডার কোনো জুতসই জবাব দেওয়া প্রয়োজন মনে করেনি। অথচ কথাগুলো ছিল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বকে উত্তেজিত করার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে হাত দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যে বদনাম করা প্রিয়া সাহা সম্পর্কে পরে জানা যায় এ দেশ থেকে সে বা তার স্বামী অনেক আগেই প্রবাসী হয়েছেন। এবং তার কল্পিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের চুল পরিমাণ কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিদেশের কাছে এই মহিলার জন্য নিচু হয়েছে। তখন কিন্তু বাংলাদেশের ইন্ডিয়া পন্থী সুশীল গ্রুপের খুশি কবির, সুলতানা কামাল, মেহের আফরোজ শাওন, শমী কায়সার এদের মুখে প্রতিবাদের একটি কথা ও শোনা যায়নি। এরা ছিল ভারতের ইশারায় পরিচালিত হাসিনা পন্থী জয় ঢাক।
অত্যন্ত উদ্বেগ জনক সত্যি কথা। ২৪ শে’র জুলাই বিপ্লবের পর দেড় বছরে ডক্টর প্রফেসর ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার আমল থেকে এইসব ইন্ডিয়ান এজেন্টরা আবার সোচ্চার হয়েছে। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করে ১৫ বছরের অধিক সময় দুঃশাসন চালিয়ে খুনি ডাইনি শেখ হাসিনা পৃথিবীর কুৎসিত রাষ্ট্র পরিচালকদের শীর্ষ তালিকায় তার নাম লেখাতে চেয়েছিল। সফলও হয়েছে। কিন্তু জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এ দেশের ছাত্র শ্রমিক কৃষক চিকিৎসক শিক্ষক সাংবাদিক রিকশাচালক দিনমজুর ঘরের গৃহবধূ সবাই রাজপথে বেরিয়ে আসে লুটেরা খুনি হাসিনার পতন ঘটাতে। অবশেষে বায়তুল মোকাররমের খতিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তথাকথিত বিনা ভোটের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী উপমন্ত্রী জুলুমবাজ পুলিশ কর্মকর্তা যারা হাসিনার লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করতো সবাই গণ বিপ্লবের তোড়ে পালিয়ে যায় গা ঢাকা দেয়, কুখ্যাত হাসিনার তক্তে তাউস মুহূর্তে খানখান হয়ে যায়।
মাত্র ৪৫ মিনিটের নোটিশে শেখ হাসিনা এদেশের কতিপয় ব্যক্তির মাধ্যমে ভারতে পালিয়ে যায়। পুরো বাংলাদেশটাকে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তার খুনি ছাত্রলীগ যুবলীগ অর্থাৎ হেলমেট বাহিনী বা হেলমেট লীগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সুবিধাভোগী একটি বিশেষ উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা গ্রুপকে লেলিয়ে দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এর মাধ্যমে জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪ শত শিশু-কিশোর তরুণ জনতা হত্যা করে, ৮০০ যুবককে গুলি করে অন্ধ করে দেয়, ৪০ হাজার যুবককে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে গুলি করে পঙ্গু করে রেখে প্রাণ বাঁচাবার জন্য চূড়ান্ত মুহূর্তে ভারতে পালিয়ে যায়। তখন কিন্তু কোন বাঙ্গু এলিট বা বাংলাদেশি তথাকথিত ভারতীয় ভাবনায় মোড়ানো বুদ্ধিজীবী বলে কথিত গোলাম ময়লা রনি, আলমগীর কবির, মাসুদ কামাল মার্কা হাসিনা পন্থী আওয়ামি বক্তা কথাও একটা কথা বলে নাই।
১৯৮১ সালে হাসিনা প্রতিশোধ নিতে ভারতের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশে আসে। নানা অভিনয়ের পর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিনা ভোটে তথাকথিত ভারতীয় ট্রেনিং প্রাপ্ত একান্ত অফিসারদের সাথে আঁতাত করে ডামি ভোটের মাধ্যমে এদেশের পাবলিকের চোখে ধুলো দিয়ে, ২০১৪,২০১৮, ২০২৪ এর নির্বাচন বৈতরণি পার হয়।
নির্বাচন কমিশন, আইন প্রশাসন বিচার, প্রতিরক্ষা স্বরাষ্ট্র সবকিছু কব্জা করেও গণরোষের মুখে দুপুরের রান্না করা খাবার ফেলে রেখে হাসিনা পালিয়ে যায় ভারতে। কী পরিহাস তাই না? হাসিনা গণবিস্ফোরণে ক্ষমতাচ্যুত হবে বিষয়টি বুঝতে পেরে আগেভাগেই নিজের আত্মীয়-স্বজনদের বিদেশ গা ঢাকা দিতে নির্দেশ দেয়। কথিত আছে, সুন্দর নগরী রোম শহর যখন স্বৈরাচারী নিরোর অত্যাচারে জ্বলে পুড়ে ছাই হচ্ছিল, হিরো তখন মহা আনন্দে নিজস্ব বিনোদনের জন্য ঢক করে, সুর করে বাঁশি বাঁজাচ্ছিল। বাংলাদেশের শেখ হাসিনা বিদায়কালে গণহত্যা পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে, খুন, অপহরণ গুম, আয়না ঘরে নির্যাতন শেষে গণহত্যা চালিয়েও টিকতে না পেরে প্রায় শতাধিক পুলিশ অফিসার নামধারী খুনি কসাইসহ পালিয়ে গেছে। কই তখন তো চৈতালী চক্রবতীদের কোনো উহ্ আঃ বা চিল্লাচিল্লি শোনা যায়নি। এখন উস্কানি মূলক বক্তব্য দিচ্ছে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য হাসিনার ডাকাতদের নির্দেশে। বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচিত তারেক রহমান সরকার মাত্র ৮ মাস ক্ষমতাসীন হয়েছে। এর মধ্যে চৈতালি চক্রবর্তীরা বাংলাদেশকে ভাগ করে একটি হিন্দু প্রদেশ বানানোর উস্কানি মূলক দাবি জানিয়ে রাজপথে নোংরা সব বক্তব্য দিচ্ছে! যার সাথে এদেশের সনাতনীদের কোনো সংযোগ নেই। যা সম্পূর্ণভাবে দেশ, দেশের সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতার প্রতি চরম হুমকি।
যেকোনো মূল্যে চৈতালি চক্রবর্তী নামের এই ইন্ডিয়ান র-য়ের চিহ্নিত এজেন্টকে প্রতিহত করা হবে সরকারের জরুরি কাজ। এইসব নষ্ট রাষ্ট্রদ্রোহী মতলববাজদের সম্পর্কে সরকার কী করে, তা’ আমরা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এএজে
