এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলি জারি করা হয়েছে সর্বসম্মতিক্রমেই। অর্থাৎ, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু, বিবেক জোশী এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ওই নির্দেশিকাগুলি জারি হয়েছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় এমনটাই জানিয়েছে কমিশন। এ-ও জানিয়েছে, ওই হলফনামাটিও তিন জনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে জমা দেওয়ার জন্য অনুমোদিত হয়েছে।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন ঘিরে গোটা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর এবং বিবেকের বেশ কিছু নোটের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিতর্কের মাঝে কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। সমাজসৈনিক রাকেশকুমার সিংহের করা ওই মামলার প্রেক্ষিতে এ বার আদালতে হলফনামা দিল কমিশন।
সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় কমিশনের দাবি, “২০২৫ সালের ২৪ জুন থেকে এসআইআর সংক্রান্ত যে তিনটি নির্দেশিকা জারি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে যে নির্দেশিকাগুলি জারি হয়েছিল— প্রতিটিই কমিশনের সর্বসম্মত ভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জারি করা হয়েছে।”
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি বিষয়ে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের নির্দেশিকা এবং তাঁর আচরণের বিষয়ে ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে আলাদা ভাবে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দুই কমিশনার— হলফনামায় সে কথা অস্বীকার করেনি কমিশন। তবে তারা এ-ও জানিয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের ‘যৌথ নির্দেশের’ প্রেক্ষিতে ওই নির্দেশিকাটি ‘কখনওই কার্যকর হয়নি’।
এসআইআর চলাকালীন ইআরও-রা কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ অ্যাপ ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। হলফনামায় এ বিষয়েও জবাব দিয়েছে কমিশন। তারা জানিয়েছে, ইআরও-র নির্দেশ ছাড়া কোনও ভোটারের নাম যোগ করা বা বাদ দেওয়া বা বদলানো যায় না। ইআরও-রা যাতে নিজেদের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বিঘ্নে নিজেদের কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর ‘ইসিআইনেট’-এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা।
নতুন ভোটারদের নাম তালিকায় তোলার জন্য যে ফর্ম ৬ পূরণ করতে হয়, তা নিয়ে বিতর্কেরও ব্যাখ্যা দিয়েছে কমিশন হলফনামায়। বিভিন্ন মহলে যে দাবিগুলি করা হচ্ছে, তা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে হলফনামায় জানিয়েছে তারা। কমিশনের বক্তব্য, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি দিতে হচ্ছে শুধু তাতেই সংশোধন করা হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ‘ম্যাপিং’-এর বিষয়টির জন্যই এটি করা হয়েছে। কমিশন এ-ও স্পষ্ট করেছে যে ফর্ম ৬-এর সংশোধন শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারই করতে পারে। ভোটার তালিকায় নাম তুলতে চাওয়া ব্যক্তিকে যাতে তাঁর বক্তব্য বা আপত্তি জানানোর সময়ে ফের কোনও নথিপত্র জমা করতে না-হয়, সে জন্যই ঘোষণাপত্রটিতে ওই সংশোধন করা হয়েছে।
হলফনামায় কমিশন বলেছে, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি শুধু এসআইআর-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্য সময়ে ভোটার তালিকা তৈরি বা আপডেট করার ক্ষেত্রে শুধু ফর্ম ৬ জমা দিলেই হবে। তাদের বক্তব্য, ওই অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি ফর্ম ৬-এর অংশ নয়। এসআইআর চলাকালীন নতুন ভোটার হিসেবে তালিকায় নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে সব নথি জমা দিতে হয়, ঘোষণাপত্রটি তার মধ্যে অন্যতম। এর মাধ্যমে আগের এসআইআর-এর তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর তথ্য ‘ম্যাপিং’ করা হয়। সেই কারণেই আবেদনকারীকে নিজের বা তাঁর বাবা-মা, কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুরমার তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
কমিশন কোনও নির্দেশিকা জারি করার ক্ষেত্রে কী ধরনের কার্যপদ্ধতি মেনে চলে, তা-ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে হলফনামায়। কমিশন জানিয়েছে, যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে যে কোনও আধিকারিকের পরামর্শ, পর্যবেক্ষণ বা মতামত বিবেচনা করে দেখা হয়। তারা বলেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ে দুই নির্বাচন কমিশনার এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে যে মতামতগুলি আসে, তা তাঁরা বিবেচনা করে দেখেন। প্রতিটি বিষয় বিবেচনা করার পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেই মতো নির্দেশিকা জারি করা হয়।
কমিশনের বক্তব্য, তাদের বিভিন্ন বিভাগ থেকে আসা ফাইলগুলি প্রথমে একজন নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। তার পরে সেটি অপর নির্বাচন কমিশনার খতিয়ে দেখেন। সবশেষে তা পাঠানো হয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে। যে সিদ্ধান্তগুলিতে কমিশন অনুমোদন দেয়, তা সংশ্লিষ্ট ফাইলে যথাযথ ভাবে লিখে রাখা হয় এবং তাতে তিন জনেরই স্বাক্ষর থাকে। শেষে সেই সিদ্ধান্ত বিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করা হয় এবং কমিশনের সচিবালয় তা কার্যকর করে।
