বেশি বেশি ইস্তিগফার করার ৭টি উপকারিতা, কী বলছে কোরআন ও হাদিস?
ফারজিয়া হোসেনপ্রকাশ:
মানুষ ভুল করে, পাপ করে এবং কখনো কখনো নিজের অজান্তেই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে। ইসলামে এসব ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার নাম ইস্তিগফার।
ইস্তিগফার শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা নয়, বরং নিজের ভুল উপলব্ধি করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং পাপ থেকে ফিরে আসার আন্তরিক প্রচেষ্টাও এর অংশ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইস্তিগফারের গুরুত্ব এবং এর নানা উপকারিতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১. আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুযোগ
ইস্তিগফারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকার হলো আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করা। মানুষ যত বড় ভুলই করুক, আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।”- সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩
এই আয়াত মানুষকে আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী হতে শেখায়। তবে তওবা হতে হবে আন্তরিক এবং পাপ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্পসহ।
২. অন্তরে প্রশান্তি ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
ইস্তিগফার মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। অনুশোচনা, অপরাধবোধ কিংবা মানসিক অস্থিরতার সময়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের জন্য আধ্যাত্মিক সান্ত্বনার মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহর স্মরণে অন্তরের প্রশান্তি সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, “জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।”- সুরা আর-রা’দ, আয়াত ২৮
৩. জীবনে বরকত লাভের শিক্ষা
সুরা নুহে আল্লাহর নবী নুহ (আ.)-এর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন এবং এর সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন।- সুরা নুহ, আয়াত ১০–১২
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে ইস্তিগফার করলেই প্রত্যেকের সম্পদ বা আয় নির্দিষ্টভাবে বেড়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়। আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ইচ্ছা অনুযায়ী ফল ভিন্ন হতে পারে।
৪. আল্লাহর রহমত লাভের পথ
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রেখে বিনয়ী হতে শেখায়। নিজের ভুল উপলব্ধি করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা ঈমানি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুরা হুদে নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়কে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে এবং আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।- সুরা হুদ, আয়াত ৩
৫. গুনাহ থেকে ফিরে আসার অনুপ্রেরণা
ইস্তিগফার মানুষকে নিজের কাজের হিসাব নিতে উৎসাহিত করে। শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, একই ভুল বারবার না করার চেষ্টা এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসম্ভব সংশোধন করাও আন্তরিক তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তওবা করে।”-জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২৪৯৯
৬. বিপদে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার শিক্ষা
জীবনে দুশ্চিন্তা, সংকট ও অনিশ্চয়তা আসতে পারে। এমন সময়ে ইস্তিগফার মানুষকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করতে উৎসাহিত করে। তবে ইস্তিগফারকে সব বিপদ দূর করার কোনো যান্ত্রিক উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। দোয়া ও ইবাদতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।
৭. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়মিত আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরেরও বেশি বার ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তওবা করি।”- সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩০৭
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার নিয়মিত ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শুধু বিপদে পড়লে নয়, প্রতিদিনের জীবনেও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
কীভাবে ইস্তিগফার করবেন?
ইস্তিগফারের সহজ একটি বাক্য হলো: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।
এ ছাড়া সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার নামে পরিচিত বিশেষ দোয়াটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, পাপ পরিত্যাগ করা এবং পুনরায় সেই পাপে না ফেরার আন্তরিক সংকল্প তওবার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
ইস্তিগফার একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর শিক্ষা মানুষকে ভুল স্বীকার করতে, অন্যায়ের সংশোধন করতে এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী থাকতে সাহায্য করে।
তাই ইস্তিগফারকে শুধু বিপদের সময়ের আমল না বানিয়ে প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলা উচিত।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
